প্রতারক প্রমাণ করতে দেড় কোটি টাকা খরচ!

জুয়েল রাজ, লন্ডন থেকে:: ব্রিটেনের আদালতে দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে, এক্সেলসিয়র সিলেটের সাবেক এম ডি, সাঈদ চৌধুরীকে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টের রায়ে প্রতারক প্রমাণ করে, বিজয়ীর হাসি হাসলেন আব্দুল বারী নামে ব্রিটিশ বাংলাদেশি এক ব্যবসায়ী। গত ৯ ফেব্রুয়ারী ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে লিখিত বক্তব্যে আব্দুল বারী এই তথ্য জানান। সাঈদ চৌধুরীকে প্রতারক প্রমাণ করতে প্রায় ১৫০ হাজার পাউন্ড ব্যয় করেছেন জনাব বারী। বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ দেড় কোটি টাকার ও বেশী।

প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সাথে প্রতারণার অভিযোগে সিলেটের এক্সেলসিয়র হোটেলের সাবেক এমডি সাঈদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আদালতে দায়ের করা একটি মামলার রায়ে বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরতের আদেশ দিয়েছেন বিচারক। একই সঙ্গে সাঈদ চৌধুরীর সম্পত্তি বিক্রয় এবং হস্তান্তরের উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে আদালত।মামলার বাদি ও এক্সেলসিয়রে বিনিয়োগকারী এবং ইস্ট লন্ডনের রয়েল রিজেন্সির পরিচালক আব্দুল বারি এই তথ্য জানান।

তিনি উল্লেখ করেন, বছরের পর বছর চেষ্টা করে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্রিটিশ হাইকোর্টে সাঈদ চৌধুরী এবং এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন। তার ব্যক্তিগত বিনিয়োগকৃত ৫৩ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য তিনি এককভাবে এই মামলা করেন বলে লিখিত বক্তব্যে জানান আব্দুল বারি। গত ২৭ অক্টোবর সেন্ট্রাল লন্ডনের কাউন্টি কোর্টের বিচারক এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মামলার রায়ে সাঈদ চৌধুরীকে ব্যক্তিগতভাবে দোষী সাব্যস্ত করে আব্দুল বারির বিনিয়োগের ৫৩ লাখ টাকা, মামলার খরচ এবং ইন্টারেস্ট সহ ১৪ দিনের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে সাঈদ চৌধুরীর প্রতি আদেশ জারি করেছেন আদালত।
এছাড়া আবদুল বারীরর এক আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সাঈদ চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পত্তি বিক্রি কিংবা হস্তান্তরের উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে আদালত। এ স্থগিতাদেশ সাঈদ চৌধুরীর বাংলাদেশের পৈত্রিক, ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির ওপরও কার্যকর হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান মামলার বাদি আব্দুল বারি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন এক্সেলসিয়রের ডিরেক্টর যথাক্রমে আবদুল লতিফ জেপি এবং আনিসুর রহমান এবং বিনিয়োগকারী সিরাজ হক ও কয়সর খান। সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের নামে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো বেশ আলোচিত। প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিরা ব্রিটেনের আদালতে বিচার চাইতে গেলে উল্টা বিপদে পড়বেন বলেও প্রতারক চক্র ভয় দেখিয়ে থাকে। এই প্রতারক চক্র সবকিছু জেনে-শুনে পরিকল্পনা করেই এসব প্রতারণা করে থাকে। সাঈদ চৌধুরীর প্রতারণার বিষয়টি ব্রিটিশ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার এ ঘটনাটি ভুক্তভোগী অন্যান্য যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিনিয়োগেকারীদের জন্য একটি অনন্য মাইলফলক। সামনের দিনগুলোতে এটি বিনিয়োগের নামে প্রতারণা করা ব্যক্তি এবং ভুক্তভোগী সকলের জন্য একটি বড় নজির হয়ে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা। বারী বলেন আমি ৫৩ লাখ টাকার জন্য দেড় কোটি টাকার উপড়ে খরচ করেছি, শুধুমাত্র ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের সাথে বিনিয়োগ নিয়ে যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রতারণা করে পার না পায় সেই উদাহরণ তৈরী করতে। এই দেশে অনেকেই কোটি কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে দেশে বিনিয়োগ করতে, কিন্ত সাঈদ চৌধুরীর মত প্রতারকদের কারণে বারবার প্রকৃত বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের সন্তানদের স্বদেশ বিমুখ করে তুলে। বাংলাদেশের স্বার্থে এদের চিহ্নিত করা এবং প্রতিরোধ করা জরুরী।

সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল বারি জানান, ২০১৮ সালের প্রথম দিকে সাঈদ চৌধুরী এবং এক্সেলসিয়র সিলেটকে বিবাদী করে মিথ্যাচার ও প্রতারণার সাতটি অভিযোগ এনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্রিটিশ হাইকোর্টে মামলা দায়ের করি। পরে সেটি সেন্ট্রাল লন্ডনের কাউন্টি কোর্টের বিজনেস অ্যান্ড প্রোপার্টি সেকশনে স্থানান্থরিত হয়। বিচারক ছিলেন এইচএইচ জে স্যান্ডার্স। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর নানা ডকুমেন্ট, সাক্ষ্য-প্রমাণ আদান- প্রদানের পর ২০২০ সালের ২৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত পাঁচদিন এ মামলার শুনানী অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানীর পর আরও প্রায় দুই মাস সময় নিয়ে গত ২৭ অক্টোবর বিচারক এই মামলার বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ ২২ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণা করেন।

মামলার বর্ণনায় বিচারক উল্লেখ করেন বিবাদীদের মধ্যে আদালতে সাঈদ চৌধুরী নিজেই নিজের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে শুনানীর দুই সপ্তাহ আগ পর্যন্ত (১৩ জুলাই) সাঈদ চৌধুরী সলিসিটর দ্বারা প্রতিনিধত্ব করছিলেন। পুরো বিচারকার্যে সাঈদ চৌধুরী এবং তাঁর সাক্ষীগণকে একজন স্বাধীন বাংলাভাষী ইন্টারপ্রিটার সহায়তা করেন। আর এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডের পক্ষে আদালতের শুনানীনে কেউ অংশ নেয়নি।

এ মামলায় সাঈদ চৌধুরী এবং এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও মিথ্যাচারের মোট অভিযোগ ছিলো সাতটি। এরমধ্যে চারটি প্রমাণিত হয়। এরপর বিচারক বাকীগুলো প্রমাণের প্রয়োাজনবোধ করেননি বলে ২২ পৃষ্ঠার রায়ের ১৮ পৃষ্টায় উল্লেখ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আব্দুল বারি আরো জানান, আদালতের রায় অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করতে ভিন্ন একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি দেয়া চূড়ান্ত রায়ে আদালত সাইদ চৌধুরী এবং তার স্ত্রী আফিয়া খাতুন চৌধুরীর মালিকানাধীন সম্পত্তির ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য ইনজাংশন জারি করেছে। তাদের ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে থাকা সম্পত্তি এবং সাইদ চৌধুরীর বাংলাদেশের সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক শেয়ার সহ তার সকল প্রকার সম্পত্তির ওপর এ ইনজাংশন কার্যকর হবে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, ২ লাখ পাউন্ডের সমপরিমান সম্পত্তি সাইদ চৌধুরী এবং তার স্ত্রীকে বজায় রাখতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্যান্য শেয়ার হোল্ডারগণ জানান, সাঈদ চৌধুরী প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অনেক বিনিয়োগ কারী সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন সাঈদ চৌধুরীর হাতে। দেশের টানে, নিজেদের সন্তানদের সাথে দেশের সংযোগ ঘটাতে বিনিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু সন্তানদের সামনে এখন আর গর্ব করে বলার মত কিছু নাই। এই প্রতারণার ঘটনায় বরং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক ধারণা জন্ম নিয়েছে।কয়সর খান নামের এক বিনিয়োগ কারী বলেন সন্তানদের চাপের মুখে তিনি প্রায় ৮০ লক্ষ টাকার মায়া ত্যাগ করে নিশ্চুপ বসে আছেন।সাঈদ চৌধুরীর এই প্রতারণার ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছ ব্রিটেনের অনেক বিনিয়োগকারী।
অন্যদিকে বিনিয়োগ কারীগণ যেন বাংলাদেশে কোন আইনী পদক্ষেপ না নিতে পারেন, সেই জন্য বিভিন্ন সময়ে সাঈদ চৌধুরী ও এক্সেলসিয়র সিলেট নিয়ে করা ফেইস বুক স্ট্যাটাস নিয়ে আইসিটি আইনে মামলা দায়ের করে, এদের অনেকের নামেই ওয়ারেন্ট জারি করিয়েছেন সাঈদ চৌধুরী।

যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে টাকা নেয়ার ক্ষেত্রে, পরিকল্পিতভাবে অনেক সময় নিয়ম নীতি অমান্য করেছেন সাঈদ চৌধুরী, এখন অনেক বিনিয়োগকারীকেই হুন্ডি বা মানি ল্যান্ডারিংয়ের ভয় দেখিয়ে ও চুপ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগ কারী জানান, একটি কালো ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে পূর্ব লন্ডনে সাংবাদিক হিসাবে হেঁটে বেড়ানো সাঈদ চৌধুরী ১০ /১২ বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। ধর্মীয় লেবাস, সাংবাদিক পরিচয় ও ইস্ট লন্ডন মসজিদের বাণিজ্যিক ভবনে অফিস নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন তিনি। জামায়াত ইসলামের রাজনীতি ঘনিষ্টতাকেও তার প্রতারণার কাজে লাগিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।

এইসব অভিযোগ নিয়ে সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কথা বলা যাবে না। আগামী ২২ মার্চ মামলার শুনানির পরবর্তী তারিখ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিনিয়োগ কারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলার ব্যাপারে বলেন, কোম্পানীর বর্তমান এম ডি এই মামলা করেছেন, এতে তার কোন হাত ছিলনা। এবং প্রেস কনফারেন্সে বিনিয়োগকারী আব্দুল বারী অসংখ্য মিথ্যাচার এবং জ্বালিয়াতীর আশ্রয় নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। মূলত প্রকল্পটি কুক্ষিগত করার জন্যে তাকে প্ররোচিত করে সুবিধা করতে না পেরেই তার এবং কোম্পানীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও হয়রানীমূলক মামলা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সাঈদ চৌধুরী।
উল্লেখ্য, কোম্পানিটিতে বিনিয়োগের নামে দেশি এবং প্রবাসী ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে এর আগে ২০১৭ সালে লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাঈদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনেন এক্সেলসিয়র লিমিটেডের একাংশের মালিক ও লন্ডন রয়েল রিজেন্সির আব্দুল বারী এবং একাশেংর আরেক মালিক কয়সর খান। সে সময় আব্দুল বারী বলেন, সাঈদ চৌধুরী এক্সেলসিয়র সিলেট নামে একটি প্রজেক্টের জন্য ব্রিটেন প্রবাসীদের কাছ থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করেন। অনেকের মতো আমি আব্দুল বারী ও কয়সর খান দু’জন মিলে তাকে বিশ্বাস করে মোট ১ কোটি ১৬ হাজার ৮৪৫ টাকা বিনিয়োগ করি।

কিন্তু প্রজেক্টের শুরু থেকে তিনি কোনো হিসাব দেননি। পরে বিনিয়োগের অনিশ্চিত ভব্যিষতের কথা টের পেয়ে বিনিয়োগ ফেরত দিতে বলি। এরপর অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করেননি সাঈদ চৌধুরী।

Developed by: