বিভাগ: সাহিত্য-সংস্কৃতি

শ্যামা পদ দে এর একগুচ্ছ কবিতা

IMG_0737

 

 

 

 

 

 

লোকটা জানলোও না

লোকটা জানলোও না……

সেও নিয়ন হাতে হেঁটেছিল আঁধার মিছিলে_

প্রতিশ্রুতির মাধ্যাকর্ষণে, আলোক কেন্দ্রের দিকে

গায়ের ঘাম, পায়ের ধূলোয়, বানিয়েছিলো অলীক আকাশ

আর দেবতা বানিয়েছিলো, সংগোপনে প্রসাদ খোর দের ।

সে স্বপ্নেও ভাবেনি তার ঘাম,ধূলো, রক্ত, আবেগ…

আকাশ হয়ে ভেঙ্গে পড়বে তারই অরক্ষিত মাথায়…।

 

লোকটা জানলোও না……

তার ঘাম-রক্তে গড়া দেবতার লকলকে জিহ্বা

চেটে পুটে খাবে তারই থেঁতলানো লাশ…

তার স্বজনের চোখের বরফ কিনবে অল্পদামে

শোকের হাটে বিকোবে কয়েক লাখী মলম…।

আবারও ঘাম, পায়ের ধূলো, রক্ত, আবেগ_

আর প্রসাদ খোর দেবতার বিলাসী মন্দিরের স্বপ্ন ।

 

লোকটা জানলোও না……

 

আজও তার অসহায় সন্তানও হাঁটে সেই আঁধার মিছিলে

নতুন নিয়ন হাতে, কানে বাধ্য সময়ের পদধ্বনি

ঝরা পাতার হুঙ্কারে, মেকী স্বপ্ন চয়নে …..

আবারও অলীক আকাশ , সেই দেবতা, মন্দির, প্রাসাদ…

হাসি চাপা আশঙ্কায় আকাশ ভাঙ্গার পুনরাবৃত্তি ।।

 

    নীল আকাশের নীচে

গ্রাম জোড়া আগ্নিদগ্ধ ধ্বংসস্তূপে_

জেগে আছে স্পষ্ট নির্ভয় গণতন্ত্রের ছাপ…।

 

অবাধ আগুনে সুষ্ঠু দহন …

মাথা গোঁজার ঠাইয়ের ছাই এ হাসে মৌলিক অধিকার ।

 

রংবেরঙের ঝাণ্ডা ধরা মুষ্ঠিবদ্ধ দগ্ধ হাতগুলো তে

‘আমার থেকে দামি’ বার্নলের সিক্ত প্রলেপ…।

 

উল্টে যাওয়া ভাতের হাঁড়িতে অন্নসংস্থান…

পুড়ে কুঁকড়ে যাওয়া যানবাহনে উন্নয়নের গতি…

বেকার ছেলেমেয়ের পোড়া শংসাপত্রে নিশ্চিত কর্মসংস্থান

জামাকাপড়ের ভস্মস্তূপে জেগে ওঠা সংস্কৃতি, শালীনতা

গর্ভস্থ ভ্রূণকেও বিরোধী দলের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ।

 

নিরপেক্ষ আগুনের সার্বভৌমত্বে _

দলমত নির্বিশেষে সফল গৃহদাহ পরিষেবা…।

 

সাম্যবাদী ভাবনায় রঙ-অহং বিভেদ ঘুচিয়ে…

কালো কালো সাম্রাজ্যে সর্ব হারার বিজয় সম্মেলন

একক ছাদ ছেড়ে একত্রে নীল আকাশের নীচে ।।

 

  পাশাপাশি

তোর কবরে আল্লা বাঁচে_

মোর শ্মশানে ভগবান।

মন্দিরেতে শঙ্খ সাঁজে_

মসজিদে ঐ আজান গান।

 

মোর সন্ধ্যে রামায়ণ-গীতা…

তোর হাদিস কোরানে_।

বল দেখি কে বলছে সেটা_

পুণ্য হবে রক্তস্নানে?

 

তুই ডুবে যা ঈদ-মহরমে…

আমার থাক হরেক পাবন।

বল দেখি্‌ কোন ধর্ম জ্ঞানে_

ভাই করে ভায়ের দহন ?

 

লয়ে পেটে ক্ষুধার আগুন_

সবাই ছুটি কর্মস্থানে।

জ্বলবে যখন হয়ে দ্বিগুন_

সেটা কোন ধর্ম মানে?

 

তোর-আমার ভিন্ন রুচি_

কাজ নেই ভাই অপমানে।

আমি নাহয় হিন্দু-ই থাকি_

তুই থাক ভাই মুসলমানে।।

 

  সবাই সমান

বৈষম্যের এক রুদ্রবীণায়_

বেঁধেছো যে সাম্যের সুর,

কেমনে বাজবে উদারতায়_

ঘুচবে সকল নিকট-দূর?

 

বর্ণ-ধর্ম-লিঙ্গ- জাতে_

টেনে বাঁধা যে সুবিধাবাদ,

কেমনে পড়বে সকল পাতে

সাম্য-সুধার নিবিড় স্বাদ?

 

মাতৃ-ভূমির ধাক্কা, চাকায়_

লুটায় মানুষ, হারায় প্রাণ,

ধর্ম বিষের ধংস-লীলায়_

বিধর্মে হানে মৃত্যু বাণ।

 

সাম্যের গানই গাইবে যদি_

ঘোচাও বিভেদ,সকল টান।

মানবতা ঢেউ ভরুক নদী_

হোকনা মানুষ সবাই সমান।।

 

    আদিম ক্ষুধা

আদিম গুহাবাসী মানুষ_

হিংস্র জঙ্গল, পাথুরে আগুন…

কাঁচা মাংসের ঘ্রাণ_

আধ ঝলসানো নির্বিচার রক্ত।

 

খাদ্য সংগ্রাহক থেকে উৎপাদক_।

বিবর্তনের পথে লক্ষ-কোটি বছর…

 

এখনও জঙ্গল, ইঁট-কাঠ-পাথরে…

মানব বৃক্ষের গায়ে জিন্সের বাকল,

মানবতা ও সুযোগ সন্ধানে গুহাবাসী,

ধর্ম প্রস্তর ঘর্ষণে অপ্রত্যাশিত দাবানল,

শিক্ষা, বিজ্ঞান ও বিশ্বায়নের কল্যাণে

পাথর হাতিয়ার থেকে উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র।

 

হাতে, মনে, ও যৌনাঙ্গে এখনও জেগে আছে

কাঁচা হিমোগ্লোবিনের অদম্য আদিম ক্ষুধা!

 

পংক্তিস্বজন : স্বজনের ভালোবাসার লোভে বিজন প্রান্তরে পড়ে থাকে হিজল তমলের ছায়া

H-10সাইদুর রহমান সাঈদ
সাহিত্যের সবচেয়ে কঠিন বিষয় হচ্ছে কবিতা। একাগ্রচিত্তে নিরন্তর অনুশীলন না করলে কবিতা লেখা সম্ভব নয়। কঠোর পরিশ্রমীরাই কবি হতে পারেন। জীবন-জীবিকার তাড়নার পাশাপাশি সৃজনশীল মানুষকে কবিতা লেখার তাড়নাও আন্দোলিত করে। তাই সুদূর যুক্তরাজ্যে শতকর্মব্যস্ততার মাঝেও অনেকেই নিয়মিত সাহিত্য চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার গৌরব অর্জন করেছেন। এ ছাড়া কবিতার মতো বিশুদ্ধ শিল্প মানুষের মধ্যে ঐক্যবোধ সৃষ্টি করে। যার ফলশ্র“তিতে আমরা পেয়েছি যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ৯জন কবির যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পংক্তিস্বজন’। যৌথভাবে কাব্যগ্রন্থ পকাশ তাদের ঐক্যবোধ ও আন্তরিকতার পরিচায়ক। এ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন এম মোসাইদ খান। সিলেটের বাসিয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা- ২০১৬। চমৎকার প্রচ্চদে ঝকঝকে ছাপা সাড়ে ৬ ফর্মার এ কাব্যগ্রন্থটি হাতে নিলেই খুলে দেখতে ইচ্ছে হয়। সেটআপ, গেটআপ, বাঁধাই সবকিছুই চমৎকার। এ যৌথ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে সকল ‘মা’কে। এ বিষয়টি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি মায়ের প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ। এটি মায়ের কাছে চিরঋণী হিসেবে মায়ের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাপ্রদর্শন।
যাদের কবিতা বুকে ধারণ করে ‘পংক্তিস্বজন’ আত্মপ্রকাশ করেছে তারা হলেন, এ কে এম আবদুল্লাহ, আবীর ইসলাম, আসমা মতিন, মোহাম্মদ ইকবাল, ইকবার বাহার সোহেল, ফাহমিদা ইয়াসমিন, মুহাম্মদ মুহিদ, মো. ওয়াছি উদ্দিন তালুকদার রায়হান ও এম মোসাইদ খান। পংক্তিস্বজনে প্রত্যেক কবির পরিচিতি ও প্রকাশিত গ্রন্থের নাম তোলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন স্বাদের কবিতার সমাহার পংক্তিস্বজন।
এ কে এম আবদুল্লাহ : তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাগুলোতে লেগে আছে ভালোবাসার রং এবং মাটির গন্ধ। অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের আশংকা আছে। তবে বিদেশি দামী পারফিউমের গন্ধের চেয়ে বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধের মাঝে ডুবে আছে যার জীবন তাঁর আবার আগ্রাসনের কিসের ভয়? সুদূর প্রবাসে কবি নিজের সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করেন তাঁর দেশপ্রেম কতো গভীর তা ব্যাখার প্রয়োজন হয় না। তাঁর ‘প্রজন্মের খুঁটি’ কবিতায় তিনি বলেছেন ‘ব্রিকলেনের গলিতে ভাবনার সমাবেশ।/ লাউয়ের নরম ডগার মতো, আমার/ নরম ডগায় নাচে সংস্কৃতির প্রজাপতি;/ কষ্টের শিথানে জ্বলে সোডিয়াম কুপি।’ শথ প্রতিকুলতার মাঝেও দেশ, জাতি, ভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতির নানা অনুসঙ্গ ওঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। চমৎকার উপমার ব্যবহার কবিতাকে শিল্পিত সুষমার উৎজীর্ণ করেছে। তাঁর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও/ আমার কাছে আজও মাটি রং খুব পছন্দ, মাটির গন্ধও।’ তাঁর কবিতার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, সমাজ বাস্তবতা, রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন অনুসঙ্গ ওঠে এসেছে। এ দেশে অতিবাহিত তাঁর স্মৃতিময় দিনের কথাও আমরা কবিতার মাঝে পাই।  ‘জীবনের প্রেসরিলিজ’ কবিতার শেষ স্তবকে তিনি বলেছেন, ‘হায়, মানিক মিয়া এভিন্যুতে/ পড়ে থাকে তৃতীয় চোখ; অনুভূতিহীন/ মার্বেল পাথরের মতো।’ এখানে চমৎকার একটি চিত্রকল্প ভেসে ওঠে আমাদের চোখে। তাঁর কাব্যকৌশল ও কাব্য ভাবনাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
আবীর ইসলাম : এ গ্রন্থে তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। আমাদের ধর্মগ্রন্থ বলে, পাপীরা মৃত্যুর পর দোজখের আগুনে পুড়বে। আর কাব্যভাবনার গভীরে ডুব দিয়ে আমরা দেখি, কবিরা রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুনে নিরন্তর পুড়ছেন। এ আগুন একজন কবিকে তাড়িত করে। জন্ম হয় কবিতার। মনের তাড়না থেকেই কবিতা সৃষ্টি। আবীর ইসলামের কবিতায় রোমান্টিকতার আবহই বেশি। তিনি এক কবিতায় বলেছেন, ‘ঘুমুতে দেয় না অবিবাহিত সুখ/ দক্ষিণের জানালা খোলা রাখি/ বিবিধ মায়ারা দরজা খুলতে চায়/ আকাশ দেখি, আকাশে তাকাই।’ একজন কবির দৃষ্টি বিশালতার দিকেই থাকতে হয়। ‘প্রেরণা’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘জ্যোৎস্নায় পুড়ি যখন মধ্যরাতে/ শেখাও তুমি ভালোবাসার গান।’ একজন কবি জ্যোৎস্নায় পুড়তে পারেন, ভাসতে পারেন, ডুবতে পারেন, উড়তেও পারেন। কেবল একজন কবির পক্ষেই তা সম্ভব। তাঁর কবিতায় সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও অধপতনের কথাও ওঠে এসেছে। সমাজের নানা অসংগতির কথাও ওঠে এসেছে। তাঁর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘অউখানো কিতা শেষ নি সবতা জীবনের/ খোলস ভেঙে গেলো উদভ্রান্ত চাতকির,/ সহস্র ঘাত-প্রতিঘাতে একটি কথার/ মানে খুঁজি জীবনের পথে, অন্ধ চোখে শুনি উত্থাল পাতাল সমুদ্রের গর্জন।’ তাঁর কাব্য ভাবনা জীবন জটিলতাকে ছুঁয়ে যেতে সক্ষম।
আসমা মতিন : এ গ্রন্থে তাঁর বিভিন্ন স্বাদের ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। তিনি সমাজের অন্ধকারে ডুব দিয়ে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ভেতরের বাস্তবতা উপলব্ধি করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর কবিতা পড়ে আমরা তাঁর প্রখর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাই। সমাজবাস্তবতাকে ভেঙেচুরে দেখার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন আমরা তাঁর কবিতায় দেখতে পাই। তাঁর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘ওষ্ঠে কাচ কাটা হাসি, যকৃতে নেমেছে/ অন্ধকার,/ উজাড় হয়েছিল উৎফুল্ল যৌবন/ আজ পতাকার তলে অসতীর নাম শুনি,/ বারে বার।/ কিছুই ফেরত দেয়া হয়নি প্রসূতির ঘরে/ স্বপ্ন ছিঁড়ে জন্ম দিয়েছিল বঙ্গের আকৃতি/ বিনিময়ে পেয়েছে কতগুলো কাঠের/ পুতুলের গল্প।’ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অগণিত নারীর অপরিসীম আত্মত্যাগ, অবদান ও পরিশেষে তাদের বঞ্ছনার ইতিহাস কাব্যভাষায় উপস্থাপন করে আসমা মতিন তার দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। সমাজের প্রতি কবির দায়বদ্ধতার কথা তিনি ভুলে যান নি। তাঁর কবিতায় রোমান্টিক কিংবা বিষণœতার ঋতু বর্ষার কথা আছে, এ দেশের কাদামাটির কথা আছে, প্রেম ভালোবাসার কথা আছে, বিরহ বেদনার কথা আছে, অনেক কিছুই আছে। তিনি তাঁর এক কবিতায় আবেগভরা হৃদয়ে বলেছেন, ‘পাঁজর সেঁকা দিনের ভালোবাসার শেষবিন্দু। রেখে যাব সমাধির ঘাটে,/ একবার নিতে এসো প্রিয়।’ তাঁর কবিতায় আমরা মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার টান দেখি। তাঁর কবিতার ভাষায়- ‘আপন ভূখণ্ডে প্রত্যেকটি মানুষকে ভালোবাসা,/ স্মৃতি হয়ে বইলো অতীতের দিন,/ মনে পড়ে ওখানে অবিরত ভালোবাসার টানে।’
মোহাম্মদ ইকবাল : এ গ্রন্থে তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাগুলোতে তাঁর দক্ষতা, কাব্যভাবনা ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। এর মধ্যে অস্তিত্বে অনুভব’ শিরোনামে একটি সনেট রয়েছে। এ সনেটে তিনি রোমান্টিক আবহে এক মায়াবী বেদনার মাঝে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চমৎকার বর্ণনা এবং এর সাথে মানবজীবনের আবেগ-অনুভূতির সামঞ্জস্যের কথা তোলে ধরেছেন। এ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘নদীচরে কাশফুল ফুটে রাশি রাশি/ ধূসর আকাশে একাকী বিরহী চাঁদ/ খুনসুটিতে ব্যাকুল বুনো হংস হাঁসি।’ এ গ্রন্থে প্রকাশিত তাঁর কবিতাগুলোতে সামাজিক টানাপোড়ন, অবক্ষয়, মনস্তান্তিক জটিলতা, মানুষের জীবন সংগ্রাম, ভোগবাদী সমাজের নানা অসংগতি প্রভৃতির প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি নিজের মতো করে কাব্যশৈলী নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তাঁর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘আমি সবিসময়ে লক্ষ্য করি শির যন্ত্রণা যেনো ছিলই না কখনো,/ আমাকে খুঁজে পাই যেনো কোনো আনকোনা তাজা বিশুদ্ধ তরুণ।/ এমনি করে যদি তোমার স্পর্শে যন্ত্রণাগুরি দূরীভূত হয়/ ঘটে যাক যেকোনো শারীরিক বিপর্যয়! ভয় নেই তাতে এতটুকুও।/ কারণ তুমি আছো আমার!/ মায়াবী হস্তস্পর্শে শোষিত হবে শারীরিক সব যন্ত্রণাটুকু।’
ইকবাল বাহার সোহেল : এ গ্রন্থে তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। তিনি তাঁর কবিতায় যাপিত জীবনের নানা বাস্তবতার কথা তোলে ধরেছেন। পরিবর্তনশীল এই জগতে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে মানুষ তার লক্ষ্যের দিকে যায়। তিনি তাঁর এক কবিতায় বলেছেন, ‘প্রহরে প্রহরে রং বদল হয়/ অদৃশ্য আর অজানা মায়ায়।’ এ মায়ার জাল কেউ ছিন্ন করতে পারে না। তাই তাঁর অপর এক কবিতায় দেখি তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘অন্তিমলগ্ন/ স্বপ্ন দেখে মন,/ বেলা বাকি নেই।/ সমুদ্র তটে মলিন বদনে বসে/ সন্ধ্যা নামার দৃশ্য দেখি।/ মেঘ ডাকছে আকাশে/ কোথাও কেউ নেই।’ এক কবিতায় তিনি ঋতু বৈচিত্রের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে চমৎকার উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি এ কবিতায় বলেছেন, ‘মেঘেরা নিয়েছে তুলে/ নীলাভ সড়ক থেকে সব অবরোধ/ পাতায় পাতায় নাচে/ সোনার ঘুঙুর পরা হেমাঙ্গী রোদ।’ ‘জলডুবা’ কবিতায় তিনি গ্রামীণ জনপদের চমৎকার প্রতিচিত্র অংকন করেছেন। এ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘রাজহাঁসের ঠোঁটে ভাসা/ আমার এই জলডুবা গাঁও/ বাতাসে ফেরে স্বর্ণচাঁপা/ শিরিষ হিজল কুরচির মধুগন্ধ ভরা/ এ এক মায়াবী ভালোবাসার নাও/ প্রিয়ার চোখের জলে ভাসা/ এই জরডুবা গাঁও।’ এ কবিতাটি পাঠক হৃদয়ে দাগ কাটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর কবিতাগুলিতে শব্দবিন্যাস বা গঠনশৈলীতে আরো দক্ষতার ছাপ রাখতে পারলে ভালো হতো।
ফাহমিদা ইয়াসমিন : এ গ্রন্থে তাঁর বিভিন্ন স্বাদের ১০টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। কাশফুলের মতো ধবধবে সাদা জ্যোৎস্নার জোয়ারে ভাসতে চায় অনেকেই। কিন্তু চাইলেই সবার পক্ষে তা সম্ভব নয়। তবে অনেকের পক্ষেই সম্ভব। ফাহমিদা ইয়াসমিনের প্রাঞ্জলভাষায় রচিত রোমান্টিক কবিতাগুলো সেরকমই ইঙ্গিত বহন করে। এ গ্রন্থে তাঁর ‘মা’ শিরোনামের কবিতাটি চমৎকার। আর মাকে নিয়ে যাই লেখা হোক না কেনো তাকে অবহেলা করার কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া তাঁর ‘জেগে ওঠো’ কবিতাটি সমাজের নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, শোষিত মানুষের মুক্তির মিছিলের শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। বর্তমান বাস্তবতায় এ রকম কবিতা বেশি বেশি লেখা প্রয়োজন। কারণ শ্রমজীবী মানুষের সামগ্রিত মুক্তিই সভ্যতার আলোকে উজ্জ্বল করে তোলতে পারে। এ কবিতার তিনি বলেছেন, ‘শোষণ করে গড়ছে তারা বিশাল বিশাল বাড়ি,/ নামীদামী পোশাক-প্রসাধন আর দামী দামী গাড়ি।/ প্রতিবাদ করার কেউ নেই তাদের ইচ্ছেমতো চুষে,/ একদিন তারা পড়বে ঠিকই শ্রমিক শ্রেণির রোষে।/ জাগরে শ্রমিক, উঠরে জেগে ঘুমাবি আর কত,/ গর্জে উঠো আদায় করো দাবি তোমাদের যত।’
মুহাম্মদ মুহিদ : এ গ্রন্থে তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। এ কবিতাগুলিতে কালের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর কল্পনাশক্তি ও অভিজ্ঞতা নানাভাবে ওঠে এসেছে কবিতায়। হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে তিনি সমাজকে বুঝার প্রয়াস পেয়েছেন। এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘ফুলগুলি ঝরে নীরবে ভাঙে স্বপ্নের বুক,/ হতাশার বিস্তার ঘটে জল গড়ানোর মতো করে।/ বিশুদ্ধতার জমিনে জমে পাপের পলি,/ নকল আলোর ঝলকানিতে সাজে অন্ধগলি।’ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশার ভেতর দিয়েই চলমান জীবন। মানুষ হিসেবে আমরা এর বাইরে যেতে পারি না। তবে অন্ধকার ঠেলে আলোর জগতের দিকে যাত্রাই মানুষের মূল লক্ষ্য। তবে এ লক্ষ্যের দিকে যাত্রাপথে নানা বাঁক পরিবর্তনকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তার এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘সোনালি দিনের গল্প/ কালে কালে অভিন্ন রয় না বইয়ের পাতায়,/ মানুষের ইচ্ছের ইতিহাস পাল্টে কত/ অস্পষ্ট বোধের পাহাড় জমে।’ কাল থেকে মহাকালের দিকে যাত্রায় মানুষ অনেক কিছুই দেখে এবং উপলব্ধি করে। এক কবিতায় বলা হয়েছে, ‘মহাকালের আলোর গোলক হাসে সরস উল্লাসে,/ রুদ্রের বিছানায় উষ্ণ অনুভব-সবুজ/ নাচে হাওয়ার বৃক্ষ ও প্রান্তরে।’ এ জগতের মায়াজালে মানুষের ছায়াও আটকে যায় কোনো কোনো সময়। তারপরও এক হৃদয়জ তাড়নায় আমরা ছায়ার পেছনেই ঘুরি। মুহাম্মদ মুহিদ তাঁর এক কবিতায় বলেছেন, ‘অনন্ত অন্ধকারে ছায়াগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়।/ ইচ্ছের বাগানের ফুল ঝরে পড়ে অবহেলায়,/ দেখা হলো না আর/ জীবনের ভাঁজে ভাঁজে গুঁজে থাকা অতৃপ্ত বাসনার গোলাপ।’
মো. ওয়াছি উদ্দিন তালুকদার রায়হান : এ গ্রন্থে তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। তাঁর কবিতায় তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর অবস্থা ও অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধে মানুষের অনন্য সাধারণ ভূমিকা, অবরুদ্ধ নয়মাসে মানুষের দুঃখ-দুদর্শা, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক-দালাল রাজাকার-আলবদর গোষ্ঠীর দৌরাত্ম প্রভৃতি বিষয়গুলোকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলেছেন। তাঁর কবিতায় ওঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুসঙ্গ। বিশেষ করে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে তাঁর কবিতা। রাজনীতির নামে মানুষকে পুড়িয়ে মারার বিষয়ও স্থান পেয়েছে তাঁর কবিতায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলার কথা তিনি ক্ষোভের সাথে তোলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘ইদ্রিছ আলী ঝুড়ি বুনে/ সাহসী শাহজাহান ইটের ভাটায় ইট পোড়ায়। তাতে কোনো দুঃখ নেই তফাজ্জল মিয়ার/ তবু তার চোখ হয়ে ওঠে ছলছল/ নীরবে ঝরে বিজয়ী সে চোখের গরম নোনাজল/ বিজয়ের দিনে অনুযোগে বলে,/ ‘মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে কিনে নেয় মাসুদ সিদ্দিকীর দল।’ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভৎস রাজনীতি ও রাজনীতি ব্যবসার বিরুদ্ধে সোচ্চার তাঁর কবিতা। তাঁর সাহসী উচ্চারণ ‘ভয়ার্ত চোখ আর কতোকাল রবে ভয়ের আঁধারে/ অসুক প্লাবনে আর কতো ভাসবে সাদা রঙের প্রাণ?/ চোখ রাঙিয়ে তাকাও একবার সম্মুখ পানে।/ হারামিরা মাথাগুলো গুজবেই শ্মশানে কিংবা গোরস্তানে।’ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভীষিকাময় দিনের কথা ওঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন এসব বিষয় নিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিনের মতো মুঠোফোনে সেই একজনের কণ্ঠ/ স্বাধীনতা দিবসেও পরবাসী চোখের ঘুম ভাঙালো/ বড় আব্বু আজকে আমাদের স্বাধীনতার দিন/ তোমাদের কোনদিন?/ স্বাধীনতার শুভেচ্ছা তোমাকে/ ঘুমের ঘোরেই জবাব দিলাম সবুজ প্রজন্মকে,/ আমাদের প্রতিদিনই স্বাধীনতার দিন।’ অপর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘পিপাসার শবযাত্রায় খুঁজে পাই,/ পাশের বালিশে নিথর দেহে/ চিকন শ্যামা চেনা মানুষটি শুয়ে আছে/ সমস্ত ঘরজুড়ে/ ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাজার রকম মায়ার ধূপ।’ তাঁর কবিতায় দেশপ্রেম ও ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয় চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠেছে। আদর্শবাদী মানুষকে হত্যা করা যায়, প্রতিষ্ঠান পোড়ানো যায়, কিন্তু আদর্শকে ধ্বংস করা যায় না- এই শ্বাশত সত্যকেও বুকে ধারণ করেছে তাঁর কবিতা। শত হতাশার মাঝেও কবিতা মানুষকে সাহসী করে তোলে। মানুষ আশায় বুক বাঁধে। তিনি তাঁর এক কবিতায় বলেছেন, ‘একখানা জীবন আমার বুকে ধুঁকে বেঁচে থাকে,/ বিবর্ণ দুইখানা চোখকে দুইখানা এনার্জি বাল্ব করে/ মন ঘরে জ্বালিয়ে রাখার আশায়,/ একখানা বিধ্বস্ত মুখকে এক ফালি চাঁদ রূপে।/ মন গগনে চিরস্থায়ী আবাসন গড়ে দেয়ার কল্পনায়।’
এম মোসাইদ খান : এ গ্রন্থটি তিনি সম্পাদনা করেছেন এবং এতে তাঁর ১০টি কবিতা ছাপা হয়েছে। তাঁর কবিতায় তিনি সমাজ ভাবনা, জীবনবোধ ও যাপিত জীবনের নানা চিত্র বৈচিত্রকে শিল্পময় করে তোলেছেন। সমাজের নানা অসংগতি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মনস্তান্তিক জটিলতা প্রভৃতি সবকিছুই এসেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘পুরাতন ভাঙা চশমায় নতুন অন্ধকার/ নির্বীক পৃথিবীর/ অবাক চোখ দখলদার হাতের মৃত্যু ব্যবসা।’ চরিত্রহীন মানুষের ইতরামী তাকে পীড়া দেয়। কবিতার ভাষায় তিনি তুলে ধরেন মানুষ নামধারী পশুদের অপকর্ম। তিনি বলেন, ‘নাড়ির গিট্র আঙ্গুলের ভাঁজ/ ছিঁড়ছে কতো হেঁচকা টানে/ পশুর ভেতর দৌড়ে মানুষ/ ডুবছে দেখো স্বার্থস্নানে।’ সমাজের নানা অবক্ষয় ও অধপতন ধরা পড়েছে তাঁর কবিতায়। চমৎকার ্উপমা উৎপেক্ষা চিত্রকল্পের ব্যবহার তাঁর কবিতাকে শক্তিশালী করেছে এবং প্রাণসঞ্চার করেছে। এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘ঝড়ের উৎসবে বৃষ্টি মাঝে রাজ-রাজ কপালে/ অনাদরী হাতের ফাঁক গলে/ তারারা খসে পড়ে সুদুর গৃহে,/ নির্বোধ কাঁপে ডুবে থাকে দিনমান/ রাতের পেয়ালায় লাল-নীল চোখ।’ তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও প্রতি পলে পলে শিকড়ের টান অনুভব করেন। যেমন- ‘মনন মজ্জায় শিকড়ের টান,/ দেখি মমত্ববোধের দীর্ঘ মিছিল।’ অন্য এক কবিতায় তিনি বলেছেন, একচোখা আলোর মোহময় ভঙ্গিতে/ মঞ্চ মাতিয়ে রাখে নিরূপম ছায়া/ সুখের সপ্তডিঙ্গায় কতো দুঃখের বিলাস। প্রমত্তা অসুখে যতো সুখ সুখ ভান/ চামড়ার গভীরে লাল-নীল কষ্ট।’

ময়নূর রহমান বাবুল এর একগুচ্ছ কবিতা

b

 

 

 

 

 

 

  আপন ঘরে অন্য কেউ

যে ঘরে তুমি বসবাস করো সুহাসিনী
আসলে সে ঘরটা তোমার নয়
যে মাঠে তুমি খেল, হাটা চলা করো
সে মাঠের খেলায় অন্যের থাকে জয়।
যে পুকুরে সাঁতার দাও,
যে নদীতে নৌকা চালাও
সে জলে তোমার হয়না ঠাঁই
চারিদিকে বিত্ত-বৈভব আছে অনেক
তোমার আসলে কিছুই নাই।
যে গল্পে বার বার বিরহ কাহিনী
সে গল্পে তোমার নাম পাই।

মায়াডোরে বাঁধা নিত্য খেলা
সুখ ভরা সংসার-
যে ঘর চির চেনা, যে ঘরে সবই আছে
সে ঘরখানি নয় তোমার।
তোমার কাহিনীতে রচিত যে গল্প
যে গল্পে তোমার অবয়ব
সে গল্পে বীর দর্পে চলে
অন্যসব কুশীলব।

সেই ছেলেটি

হালকা গড়ন, ঝাকড়া চুলে
টানা টানা কালো চোখে
সাইকেলেতে প্যাডেল মেরে
রোজ সকালে আসতো যেতো…

মাষ্টার বাবুর ধারাপাতে
গান গাইতো সে রেডিওতে
রাজপথেও মিছিল দিতো
লেখা-পড়ায় কবিতা গানে
সবকিছুতেই প্রথম হতো…

সেই ছেলেটি আমায় একদিন
চিঠি দিল। অনেক কথা লিখা তাতে-
কী লিখেছে ?
অতশত মনে যদিও আজ পড়েনা
নির্ঘাৎ তাহা ছিলো প্রেমের !
এই বয়সের ছেলেরাতো তাহাই করে।
সেই চিঠিতে আমার খুশী উথলে উঠে
প্রেম যমুনায় জোয়ার আসে…

সেই ছেলেটি ভালো ছিলো-
এত্তো ভালো, সকল কাজে।
আসলে সে দেয়নি চিঠি
ইহা আমার কল্পনাতেÑ
যখন তারে দেখতাম আমি
আসতো যেতো সামন দিয়ে
আমার তখন মনে হতো :
এই বুঝি সে বলবে কথা, দেবে চিঠি
চিঠি কিংবা কথা কিছু দেয়নিতো সে
তবু আমার বুকের মাঝে
তার কথাটা সদাই বাঝে
ঝাকুনি দেয়, মিছিল করে…

সেই ছেলেটি যুদ্ধে গেল, একাত্তরে
মা’র পা’য়েতে সালাম দিল, দোয়া নিল
আমার দিকে চায়নি তখন, ব্যস্ত ছিলো !
জড়িয়ে ধরে মেশিন গানে। এগিয়ে গেলো

আমি তাহার পথের দিকে চেয়ে থাকি-
দূর অনন্তে চোখের পলক শেষ দিগন্তে-
আজও আমি চেয়ে আছি… ফিরেনি সে.. ।

খোঁজা

আজ সায়াহ্নে পিল পিল করে মনে
তোমাকেতো কোথাও খোঁজে পাই না
নাগালের চতু:সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছ তুমি
গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে বেড়াও এখন
স্বাধীনতার স্বাধ তুমিই কেবল পেয়েছ
সব ধরা-ছুঁয়ার বাইরে তোমার অবস্থান..

আমি এখনো শ্লোকের পর শ্লোক আর
লাইনের পর লাইন আবৃত্তির ঢেউ তুলি
আমার ভরা কণ্ঠের জোরালো আওয়াজে
সারা সভা প্যান্ডেল থর থর কেঁপে উঠে
শ্রোতাদের মুহুর্মুহু হাততালি বাজে অবিরাম
কিন্তু তোমার কেন এতো নিরবতা
কেন তুমি থাকো এতো শুনশান ?

নিরব ছিলে তুমি তখনো আবার সাহসীও
শুধু সাহসী নয় তুমি ছিলে প্রচন্ড বিপ্লবীও
শিকল ভাঙার কতো যে গান গেয়েছ
শক্ত শিকল তুমি ভেঙেছও বার বার
তবু তোমার কেন যে ছিল না
ছুঁ মেরে শক্তিধর ঈগলের মতো
আমাকে অনায়াসে তুলে নেবার

স্মৃতিগুলো আমার

কর্পূর দেয়া ছিলনা বলে আমার তোরঙ্গে
পুরনো স্মৃতিগুলো সব
তেলাপোকা, উইপোকা, পোকামাকড়ে মিলে
খেয়ে দেয়ে ভষ্ম করেছে।
কতো মধুর স্মৃতি ছিলো
জমানো কতো সোনার স্মৃতি
রূপোর স্মৃতি মণিমুক্তা খচিত।

সুখের স্মৃতিগুলো আজ নাই
খেয়েছে ইঁদুরে অথবা-
কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে
মিশে গেছে বাতাসে।

দুলি অঞ্জলি, কেউ এখন আর স্মৃতিতে নেই
সুনা হিরু’র নাম ই তো আর মনে নেই আজ..

সামনে বাকি অনেক কাজ,
সামনে আগাই, পিছন ফিরে তাকাই
সাথে আছে কিছু বিরহের স্মৃতি
মনে পড়ে শুধু হারানোর কথা-
কুরে কুরে মোচড় মারে শুধু-
বিচ্ছেদের ব্যথা, হারানোর বেদনা
ও গুলো খায়নি ঘূণে, তিতা বলে
মিষ্টি স্মৃতিগুলো একেবারেই আজ আর নাই
টক্ ঝাল বিস্বাদের গুলোই শুধু বয়ে বেড়াই।

দু:খ তবু দাও

এই মেঘলা মেদুর বরষা দিনে
তোমার হাসিতে সুখ দিতে না পারো
চোখের জল তবে ফিরিয়ে নাও।

এই শিউলি ফোটা সেফালী ঝরা
শিশির ভেজা রূপালী শরতে
গোলাপ দিতে যদি না পারো
জুঁই চম্পা আর চামেলীতো দাও।

সোনালী হেমন্তে সোনার দোলায়
শীত সকালের মিষ্ঠি পিঠায়
কুল কামিনির গন্ধ না দাও

পলাশ ফোটা শিমুল রঙে
কৃঞ্চচূড়ার লাল আঙিনায়
দাঁড়িয়ে তুমি বারেক ফিরে
আমার দিকে একটু তাকাও

সুখ যদি না পারো
দু:খ তবু দাও।

জীবনের বিষয়গুলো

জীবনে অনেক সত্য আছে
স্পষ্টকরে যা যায় না বলা
জীবনে অনেক বাঁধা আছে
চাইলেও তা যায় না দলা।

জীবনে অনেক ব্যাথা আছে
কোথায় ব্যাথা যায়না বুঝা
জীবনে অনেক হারিয়ে যায়
কখনোও তা হয়না খোঁজা।

জীবনের অনেক কষ্ট থাকে
সুখের দিনে যা পড়েনা মনে
জীবনের অনেক স্মৃতি কথা
ভেসে উঠে তা ক্ষনে ক্ষনে।

এ কে এম আব্দুল্লাহ’র দুটি কবিতা

akm

 

 

 

 

 

 

প্রথম জীবন

চোঙার মত বন্দুকনল সম্মুখে উর্বর প্রাণ।

পৃথিবীর বাগানে ফোটে কোমল ফুল

দেহময় আসমানি পবিত্রতার ঘ্রাণ।

ঝলসানো পাপড়ি, নেই সেই উজ্জলতা

পুষ্টিহীন বৃক্ষ থেকে ঝরছে কেবল

জীর্ণশীর্ণ দাগ উঠা দুঃসময়ের বাকল।

 

মাংসহীনদেহ বুকে ভাসে কঞ্চির পাঁজর

আঁটি বাধা জাতি কেবলই গলা ফুলায় !

জীবন ঘুমায় খাটের নিচে

শীতার্ত জমিনের মত ভেসে আসে

আগুনের ঘ্রাণ।

ইউরোনিয়াম রাঙা ভোরের কলজে

ক্রমশঃ হয় অবশ, চোখফেটে বের হয় রক্ত ;

বর্ষায় ধূয়ে যাওয়া মাঠের মত

মুছে যায় প্রথম জীবন।

 

মাটির ভিতরই আবার হয় মাটির জন্ম

প্লাস্টার ক্লাস্টার হয় উর্বর, মানবতার কোমল জীবনে।

সচেতনা

সচেতনা,সমুদ্র নাভির মত উত্তাল পেট

কালের চাদর মোড়ে বেঁচে আছি

উন্মোখ চোখদ্বয় ঐ উদ্যান পানে।

 

সচেতনা, তুমি ফুলেল খোলস ছেড়ে

রঙিন পেন্ডেল, টিভি টকশো থেকে

নেমে এসো

কটিন রুঢ় বাস্তবতায়,

দেয়ালে টাঙ্গানো নিতীবান ফ্রেমের ভিতর থেকে

বেরিয়ে এসো

মুমুর্শ বিবেকের পাশে।

 

এখানে এখন চাইনিজ নুডুলস

ইটালিয়ান ব্রেড কিংবা

থাই ফ্রাইড রাইসের বরই কদর ; অথচ

স্বপ্নের সন্তানেরা বড়ই ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত

অন্ধের মত,দিন বা রাতের পার্থক্য খুঁজেনা

অথবা নিরামিষ কিংবা ফ্রাই !

 

সচেতনা তুমি নেমে এসো উপর থেকে

আসমানি রোদ মেখে,

মেঘের কালো আস্তরণ ভেদ করে।

 

এখন এই পৃথিবীতে আলোর বড় প্রয়োজন ;

তোমার আলো ।

আবদুল হাসিব-এর একগুচ্ছ কবিতা

hasib bhai

 

 

 

 

 

 

মূর্ত অভিসার

তুমি হাঁটছো কী না জানি না

বিশ্বাসের উর্বর মাঠে দাঁড়িয়ে

আমি দেখছি তুমি হাঁটছো

শেফালি ঝরা ধূলিপথ চল-চঞ্চল পদচালন

হাসনুহানার বিমুগ্ধ গন্ধ বিভোর চারিধার

পূর্ণেন্দুর মিষ্টি আলো তারাদের হাতছানি

অভিসার অনুরাগী তুমি

ফুরায়না পথ কাটেনা প্রহর কামুক অস্থির মন

তৃষাতুর অঙ্গুলী স্পর্শ প্রত্যাশা প্রতিক্ষায় থাকা;

আঃ হাঃ! এখনও কী যে অক্ষত; জীবন্ত অন্তর্গত।

 

বিশ্বাসের বেহায়াপনায় আমি পরাজিত

আমি বিনিদ্র রাত্রি জেগে দেখছি, কেবল দেখছি

তোমার সুঢৌল উর্ধমুখী বুকের কম্পন

কসে কসে পড়া কাঁচুলির মগ্ন সঞ্চালন

তুমি এখনো কুঞ্জপানে হাঁটছো

দ্রুত পদব্রজে অক্লান্ত তুমি হাঁটছো

জ্যোৎস্না-শিশিরে স্নাত হতে হতে

শরীরে তুমি প্রষ্পরেণু মাখছো।

 

কামিনী তোমার এমন কুস্তুরী গ্রাণ

অধীর অস্থির করেছে তনু-মন-প্রাণ

নগ্ন শরীরে মাধকানন্দে তুমি কামধেণু

আমি দেখছি তুমি বিভোর কামনাকাতুর

তুমি দু’হাতে কুচভরে ঝরা ফুল তুলছো

আমি নিরন্তর ঘ্রাণ নিচ্ছি;

আমার হৃদয়ের অস্থিত্ব ভরে ঘ্রাণ নিচ্ছি

তোমার নগ্ন দেহের ভুবনমোহিনী ভাজে ভাজে

যে বিমুগ্ধ গন্ধ আমার কামুক হৃদয় অস্থির করে তুলতো

সেই তৃষাতুর ঘ্রাণ হৃদয় পরতে আজো জীবন্ত অম্লান।

 

তুমি চিরটাকাল রাত্রির দিকে ধাবমান

প্রতিক্ষার প্রভাত আমার জন্যে নিয়ে আসে

ক্লেশ-ক্লান্তি-গ্লানি আর যতো অপমাণ! প্রেয়সী আমার

আমি তোমাকে দেখছি, দেখবো অনন্তকাল।

কী ভাবে পারে ওরা

কী ভাবে সম্ভবপর

ধর্ম-কর্ম সমাজ সংসার

অত:পর লিখে যায় কবি

দু:খ সুখের বিচিত্র সমাচার।

 

তার বুকের ভেতর থাকে সাহসের ঘর

কবির থাকে না তাই ভয়-ভীতি-ডর

আঙিনায় ছড়ানো থাকে সহস্র সাধ

মিটিবার প্রত্যাশায় প্রচেষ্টা অগাধ

কবির থাকে প্রেমাসিক্ত দু’খানা বাহু

স্পর্শ করে না তারে নির্মম রাহু

খুলা প্রাণে গায় গান কারণ-অকারণ

হৃদি যমুনায় চলে মগ্ন সন্তরণ।

 

কতো জনের প্রার্থনা কতো ভাবে সুর সাধা

সে কি আর শুনে বাধা

হৃদয় কাননে যার

রাশলীলা রাধা।

 

ষোল শো গোপিনী ভুলায় মগ্নলীলায়

কবি জ্বলে, কবি জ্বালিয়ে ভুলায়

কবি ভাবে কবি লিখে, কবি ভাবায় লিখায়

কবি শক্তি দেয় শক্তি পায়;

যতো ক্লান্তি দু:খ ক্লেশ গ্নানি

সকলই ভাসায় কবি প্রেম যমুনায়।

 

কবি বিশ্রাম বিলাসে বসে

কল্লোলিনী তীরে

মহুয়ার নীল অরণ্যে ঘিরে

প্রশান্তির বাতাস বয় খুব ধীরে ধীরে;

চেয়ে দেখে নিলীমায় উঠে মোটা চাঁদ

কবির কলমে কী আর মানে কোন বাঁধ।

বিরহিণীর শোকগাথা

মিথুন মৈথুনে মত্ত্ব হলে

অনায়াসে বিছানা বালিশ ঠিকানা হারায়

প্রসন্ন প্রশান্তি লাগে

ভোরের বিছানা যখন মুগ্ধ তৃপ্তির স্বাক্ষর ভাসায়।

 

কামুক নাগর কামাতুর হলে

আসক্ত কামিনী কামাগ্নি জ্বালায়

স্নানপাত্রের বদ্ধ জলের মাঝেও তখন

সামুদ্রিক তরঙ্গ উঠায়।

 

দূর থেকে ভাসে চোখে, শান্তি তার সারা বুকে

স্নানাগার ছেড়ে এসে মৃদু পায়ে হেঁটে হেঁটে

তৃপ্তা রমণী যখন রমণের রেশটুকু পান করে সুখে;

আমার দু’চোখ ভরে শ্রাবণের বরিষণ ঝরে বড় দুঃখে।

 

আমার হয়নি বুঝা বিছানার ভাষা

আমার জলাশয় তীরে লাগেনি কোন ঢেউ

আমার মিঠেনি আজো কামনার আশা

আমার আরতি গুলো গ্রহণ করেনি কেউ।

 

আমার জীবন যৌবন তবে কি বরফ জমাট জলাশয়;

আমার বুকের ভাষা কি তবে কঠিন নিরব হিমালয়!

আমি আসবো ফিরে

বর্ণালী আকাশের নীচে নদীর তীরে

বসে আমি আছি একা, হয়ত বা কাল

চোখের হবে না দেখা প্রসন্ন সকাল,

মুছে যাবে সব রঙ অন্ধকারে ধীরে।

এই পথে এই মাঠে এই নদী ঘাটে

যখন আর আসবো না হে রূপরাণী

করুণ নিঃশ্বাস কোন ফেলবে না জানি

তবুও সাধ হবে আসতে এই নাটে।

 

বারে বারে তোমার রূপ উঠবে ফুটে,

নীলাকাশ ফুল ভ্রমর নদীর পানি

ভরে থাকবে হৃদয়ের প্রচ্ছদ খানি

গোধূলির আবিরে আমি আসবো গুটে।

পূর্ণিমা জ্যোছনায় আমি আসবো ফিরে,

শিশির চাদরে আমায় রাখবে ঘিরে।

কর্মরত থাকে

ঘুণপোকা ঢুকে গেলে কর্মরত থাকে

যতক্ষণ সড়ঙ্গ পথ শেষান্তে আসে

কেটে যেতে ততক্ষণ খুব ভালোবাসে,

বিষাক্ত দন্তের দ্বারা সে নকঁশা আঁকে।

ঘরের গৃহস্থ শুনে গুঞ্জন পোকার

ভয়ে কেঁপে উঠে বলে করি কী উপায়,

নিধন করতে পোকা ঔষধ লাগায়

পোকার হয় না কিছু, ঘরের বিকার।

 

দিনে দিনে কাঠামো ঘরের কসে পড়ে,

এক দিকে ঠেস দিলে অন্য দিকে নামে,

মড় মড় শব্দ করা কিছুতে না থামে,

একটু বাতাস এলে সারা ঘর নড়ে;

অবশেষে একদিন ঘর পড়ে যায়,

শোকাহত উত্তরসুরী অশ্রু ঝরায়!

আবু মকসুদ এর একগুচ্ছ কবিতা

muksud

 

 

 

 

 

 

যাবতীয় ক্লান্তরি পালক

ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িগুলো বাড়ি ছিল

মায়ের মমতার মত তারা আমাদের আগলে রাখত

বাড়িগুলোর মাটির মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে

আমরা চলে যেতাম স্বপ্নরাজ্যে, যেখানে

রাজার কুমারী কন্যা সিথানে দাড়িয়ে পালকের

পাখায় তাড়িয়ে দিতো আমাদের যাবতীয় ক্লান্তি

 

বাড়ির টিনের ছাদে বর্ষার অবিরাম গান

আমাদের সপ্তসুরে বাধতে চাইলে, মাজা পুকুরের

ব্যাঙ পাঠাত স্নানের নিমন্ত্রণ, আমরা নেমে যেতাম

অনন্তকালের স্নানে। পুকুরের জল ছুঁয়ে বেড়ে

উঠা নেবু-গাছগুলো তাদের নির্লজ্জতা দেখিয়ে

লোভ জাগাত, শরীরে খিধে জেগে উঠলে

অসমাপ্ত স্নান শেষে ফিরতাম, চাটাইয়ে

সাজানো মাটির সানকিতে আমাদের মায়েরা

ঢেলে দিতো বকুল ফুলের মত ধবধবে সাদা ভাত

শর্ষে ইলিশ আর কাঁচা লঙ্কায় পূর্ণ উদরে আমরা

ছেলেবেলার বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতাম।

 

বাড়ির লেপা উঠানে ক্রমাগত পায়ের ছাপ

এঁকে এঁকে আমরা বড় হয়ে উঠলে দেখতাম

বাড়িগুলো আর বাড়ি নয় তারা হয়ে উঠেছে

ইট, কাঠ, কংক্রিটের তথাকথিত বাসা-

কৃত্রিম ঝর্ণা কিংবা বাথটাবের জলে আমাদের

ছেলেবেলার বাড়ি গুমরে মরে, ক্লান্ত দেহ

মেঝেতে আশ্রয়ের খোঁজে লুটিয়ে পড়লে

সারা শরীরে অনুভূত হয় অযাচিত ইটের ধর্ষণ।

ভেজা সন্ধ্যা

হাতে হাত রেখে
দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে
হাটার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে

দূরের সংগীত
ধীরে ধীরে বোধগম্য হতে থাকে
বাতাসের ধাক্কায় শিরিষ পাতাগুলো
তিরতির কাঁপতে থাকলে
আমি ভাবি
কাটানো যাবে
একটা লঘুকরণ সন্ধ্যা

শেষ স্টপের এখনও ঢের বাকি
সূর্য তার গেরুয়া বসন সদ্য খুলেছে
ফুলের পাপড়িরা খুলেছে
নির্ভাবনার খোঁপা

সন্ধ্যার প্রাক্কালে হঠাৎ বিস্ময়াবিষ্ট বৃষ্টি
তুমি বললে- এসো ভিজি
বললাম- আমি সিক্ত হয়েই আছি

অন্য মানুষ

নগ্ন পায়ে পায়চারী করতে থাকলে
ক্যাফিনের ফ্লেভার গুলো মস্তিষ্কে
ছড়িয়ে পড়তে পারে ভেবে থামি
ওপাশের পাপোষে পা দুটি একটু
রগড়িয়ে পুনরায় পায়চারী শুরু করব
কি না দ্বিধান্বিত হলে মনো অন্দরে
তোলপাড় শুরু হয়, ভয়াবহ ঘটনার
প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবী কি দুলে উঠলো?
ঘরের বিছানায় যে নিষ্প্রাণ শরীর
তার সাথে কি কেটেছিল কিছু অনবদ্য সময়?

ইতিমধ্যে যা ঘটার ঘটেছে, ঘড়ির কাটায়
সময় পেরুচ্ছে সময়ের ঘাট, আমিও আটঘাট
বেঁধে ভোরের প্রতীক্ষায় হাতে নেই কফির পেয়ালা
তিনের পরে চতুর্থ পর্বে মস্তিষ্কে যদি
ক্যাফিন ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি কি
ভাবিত ক্ষণ পেরিয়ে ভোর হবে
প্রভাত আলোয় উন্মোচিত হবে
মানুষের অন্য রূপ, কত অবলীলায়
মুছে ফেলা যায় প্রাণ, ঝেড়ে ফেলা যায়
জগত সংসারের মায়া, আজ ভোরে
প্রমাণিত হবে মানুষের ভিতরে থাকে
অন্য মানুষ, হন্তারক মানুষ
প্রাণ সংহারের পরেও মেতে
উঠতে পারে ক্যাফিন বিলাসিতায়

সুন্দরবনের জন্য এলিজি

বিদ্যুতে পারদর্শী কিংবা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ
আমাদের কাঙ্ক্ষায় থাকুক, বৈরিতায়
পথ পাড়ি দিতে হবে এমন আত্মঘাতী
পরিকল্পনা স্থগিত করে পাখিদের নিঃশ্বাস
নিশ্চিত জরুরী, গাছেদের পাতায় সবুজ
রঙের অবিরাম সরবরাহ আছে জানিয়ে
ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে পৌঁছাতে হবে
চিত্রল হরিণ, চিত্রা তীব্র গতিতে
পেরিয়ে যাচ্ছে সুন্দরী বৃক্ষ, এমন দৃশ্য
ভেবে আমাদের উৎকণ্ঠিত মন তড়পাক
নিজেদের আশ্বস্ত করতে পারব ধারাবাহিকতা
রক্ষা হচ্ছে, মন ও মননে প্রকৃতি থাকুক
তার সহযোগী হয়ে পৌঁছাই সবুজাভ সময়ে

প্রকৃতির পথে হাঁটলেই নিশ্চিত হবে সূর্যের
সুষম বণ্টন, অযাচিত তাপে এবং চাপে
বিপর্যস্ত হয় মানুষ ও প্রকৃতির প্রাণ
সত্য সভ্যতার জন্য সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে…

গল্পের শেষাংশ

পূর্বপুরুষের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করতে করতে
আমরা পৌঁছি প্রখর সূর্যের দেশে
খনন কার্যের প্রারম্ভেই পেয়ে যাই
একটা পতাকার অবশিষ্টাংশ
স্বপ্ন গল্পের শেষাংশ
দেখব বলে খনন জারী রাখি
তর্জনী হেলানোর দাপট
তাদের আত্মাকে পুনর্জীবিত করে
আমরা দেখি আদিম খোলস ছেড়ে
তারা বুনে যাচ্ছে মানুষের মাঠ
পাখিদের সংসারে লিখছেন
পালকের পতন কথা
ঘাসের বিছানায় শুয়ে
অনাগত ভবিষ্যৎ ভাবছেন
ঠেকিয়ে রাখছেন পতন্মুখ আকাশকে
প্রতিদিন ভোরে মানুষ সূর্য পাবে
নিশ্চিত হলে তারা ডুব দেন
পদ্মা মেঘনা সুরমার জলে

আমাদের আমোদ কালে
তারা কিছুটা বিস্মৃত হন
এই সুযোগে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী
স্মৃতি ফলকে চালায় বিভ্রান্তির হাতুড়ি

মিথ্যার ব্যবসায়ী এসব ঘাতক
সফল হয়েছে ভেবে আত্মতৃপ্তির
ঢেঁকুর তুলে

আমোদ পর্ব শেষে আমরাও জেগে উঠি
পূর্বপুরুষের সূর্য করায়ত্ত বিদ্যায়
আমরাও কম পারদর্শী নই
প্রমাণিত হলে দুষ্কৃতিকারীরা
চালায় মরণ কামড়

আমরা জেনে যাই
দড়ি এবং খোয়ারের অনিবার্যতা
কর্মপন্থা স্থির করে
এগিয়ে যাই
পূর্বপুরুষের পতাকা
পুনরায় প্রতিস্থাপিত হবেই…

শামীম আহমদ’র তিনটি কবিতা

shamim

 

 

 

 

 

 

কামিনী
সনাতন পথ ধরে তুমি এলে ফিরে ,
নিকুঞ্জ কাননে-
তপোবন কেঁপে কেঁপে ওঠে, নূপুর ঝংকারে ।
মহা ঋষি মুখ তুলে চায় ,
ধ্যান ভেঙে বলে কে এলে অবেলায় ।

সে বলে ,আমি কামিনি গো স্বামী ,
জটাধর মৃদুহাস্যে বলেন,ও কামিনী তুমি ।
কি নিতে চাও আজ বল্,
নাগের মনি ,না কি হলাহল ;
যদি হলাহল চাও
এক্ষুণি নিতে পার,
না হয় নিজের পথ ধর ,
আর যদি মনি চাও
৩৬ বছর তপস্যায়
তপোবনে থেকে যাও ।

কথা শুনে কামিনী উঠিল চমকিয়া ,
তা তা থৈ থৈ ছন্দে নাচে তপোবন জুড়িয়া ,
পাতাল হতে উর্ধ্বাকাশে যেন বিজুলি তড়িৎ ,
ঋষির বনতল পুড়িবে কি হায়
বড় সাধনার বন চিরহরিৎ ।

না না বলে মহাঋষি জ্বেলে তপস্যার মশাল ,
নিজেকে পুড়িয়ে করিল ভস্ম
নিজেই ছিড়িল তার ভবের শৃঙ্খল ।

বিফল মনরথ নিয়ে কামিনী দেবী ,
বলে সখা,আমার কি একার দুষ ছিল সবি ,
তুমিই ত তুলে ছিলে পঞ্চশরের সুর ,
সুরে সুরে হয়েছে সখা কতরাত ভোর ,
এখন কেন একা ফেলে,চলে যেতে চাও ,
একটু দাঁড়াও আমিও আসি,তুমি যেথা যাও ।।

রক্তের ঢেউ
এবং প্রতিউত্তর আসে ,
হে মানুষ , তুমিতো দেখার কথা ছিল –
সভ্যতার মিনার চুঁড়া ভেঙে ফেলে
তেড়ে আসা রক্তাক্ত ঢেউ ,
নিভিয়ে দেয় জীবন প্রদীপ ,এশিয়া বেবিলন
ইউরোপ আমেরকা আফ্রিকা
তুরস্ক কেনো আজ মৃত্যুদ্বীপ !

ভাগ্যের তীর কখনো তেড়ে আসেনা ছুটে ,
মিহিন বাতাসের বুক ছিড়ে,যদি কোন তীরন্দাজ
নিশানা না লাগায়,অসহায় সময়ের পিটে !
জীবন তরী যাচ্ছে চলে মোহনায় ,প্রতি মুহুর্তে;
জলও তার গতিপথ নিজেই খোঁজে ,
মানুষ কিন্তু মোহগ্রস্থ , পোষা কুকুরটাও সজাগ
নিরাপত্তায় ,তার দ্বায়িত্ব বুঝে ;

হে মানব সত্বা , তুমি এখনো নখ দর্পণে স্রষ্টার ,
তোমার আত্মাতে যদিও তোমার দখল কিন্তু –
তা সময়ের খোরাক মাত্র ,
নিঃশ্বাস উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছো অজানায়-
অপেক্ষায় আছে মহাকাল অন্য এক অধ্যায় ।

অচ্ছুত সত্য
হৃদয়ের দর্পণে অস্পষ্ট একটি মুখ
কখনো ভেসে উঠে,আবার হারিয়ে যায় অন্ধকারে ,
আলোহীন জীবন ত,তাই টাহর করতে পারিনা
আজকাল মনেহয় রেটিনাতে গ্রহণ লেগেছে চিরতরে ।

বুকের মরুদ্যানে লু,হাওয়ার তান্তব লীলা
দূরে বহুদূরে ঘুর্ণায়মান অবয়ব,বায়ুর সুড়ঙ্গ পথে
পিচকারি দিয়ে ফেনায়িত রক্তের বুঁদবুঁদ নিঃসরণ
তৃষ্ণায় নেমে আসে জিহ্বা রক্তের সরোবরে কোনমতে ।

তবে কি রক্তই একমাত্র পানিয়,জঠরের ঋন
ভুলে গেছি সেই কবে,তালিয়ার তালি দেই মানবতা ভুলে ,
অচ্ছুত সত্যকে জানার ইচ্ছা ছিল প্রখর কিন্তু না
আর হবে না মনে হয়,সত্যকে রেখেছি তাসকায় তুলে ।

বঙ্গবন্ধু-কে নিবেদিত ছয়টি কবিতা

sb

আতাউর রহমান মিলাদ

আমি জন্মেছি তোমার মৃত্যুর ভেতর

আমি জন্মেছি তোমার মৃত্যুর ভেতর
আমাকে কী করে ফেরাবে এই বেহুদা সময়
জীবন ঘনিষ্ঠ রাখি তোমার মহান মৃত্যু পাঠে
জেনেছি জীবন, মৃত্যুর আরেক ঠিকানা

পায়ের চিহ্ন ভুলে ঘাসের ডগা জেগে উঠে ফের
আমিও জেগেছি দেখো তোমার মৃত্যুর ভেতর
সমস্ত সঞ্চয় জমা রেখেছি রোদের উমে
শিশির হরণ করে পৌঁছে যাব আলোর আড়তে

জন্মের অপর পৃষ্ঠায় থাকে মৃত্যুর স্পষ্ট দাগ
মৃত্যু নিয়মে হলে মেনে নেয় ফুল পাখি পাতা
যতটা পতন চিহ্ন ইঁদুরের ধারালো দাঁতে
ঘরের দাওয়ায় পুঁতেছি তাই জন্মশত্রুতা

যতই কাটাই জীবন সংসারী মোহে
হত্যার প্রতিবাদে জ্বলে উঠবই দ্রোহে

আবু মকসুদ
পিতৃঋণ

যে বুকে পিতার ছায়া, সে ছায়া জলে, অন্তরিক্ষে
সে ছায়া জেগে র’বে হাজার বছর

যে পাতিল ভেঙে পরে ঘরের আঙিনায়
সেই ঘর ছিল তাঁর বুক
সেই ঘর পারবে না মুছতে তাঁর ছায়া
যতই হোক খেলা পাতিল ভাঙার

যে বই ঘুণে পোকা খায়, পাতা ছিঁড়ে নিয়ে যায় ধূর্ত শকুন
সেই বই ছিলতাঁর চোখ, যক্ষের ধন
সেই বই মহাকালে বলে যাবে তাঁর কালকথা
শকুনেরা মিশে যাবে ধুলায় ধুলায়

কালের কালিতে যে মূর্খ করে আস্ফালন
হাঁটুজলে চড়–ইয়ের বেসাতি করে, মূর্খতা
জানবে না কোনোদিন পড়ন্ত বেলাকে সে আনে ভোরের আলোয়
হাতের তালুতে করে সমুদ্র ধারণ

যে বুকে পিতার ছায়া, সে ছায়া জলে, অন্তরিক্ষে
সে ছায়া জেগে র’বে হাজার বছর

মনে পড়ে সে বিষণœ রাতের কথা
কাপুরুষ পশুদের সীমাহীন নির্লজ্জতা
হলুদ পাখিটির ঠোঁটে এক টুকরো খড়
ঠোঁট থেকে খসে পড়ে খড়, মাটিতে মাথা ঠুকে লজ্জায়, গ্লানিতে

কাপুরুষ পশুদের মৃত্যু হয়
মূর্খদের মৃত্যু হয়
ধূর্ত শকুনের মৃত্যু হয়
পাপীদের মৃত্যু হয়
তাদের সমাধি হয় কুকুরের বিষ্ঠায়

পিতার মৃত্যু নেই
পিতা বেঁচে থাকেস ন্তানের বুকের ভিতর

শাহ শামীম আহমদ
শোকাহত পদাবলী

শোক :
চারদিকে শুধুই দীর্ঘশ্বাস
বাতাসে ভর করে আছে পনেরই আগস্টের শোক
শোকের পাথরে টুকে টুকে পিতা ভেঙে যায় বুক

খুনি :
শোকের নদীতে আছে ভালোবাসা বুকের নদীতে বিদ্যুৎ
আমি খুনি হতে চাই পিতা একবার বলে দাও
বলে দাও হে দেবদূত।

দ্রোহ :
চিত্তলোকে আনন্দ
অন্তরে দ্রোহ অন্তরে বিষ!
মুজিব নামেই যেন জ্বলে অহর্নিশ।

কাজল রশীদ
আগস্টের প্রত্যুষে

হুতোম পেঁচার কু-উ-কু-উ শব্দে বিভোর হয়ে ওঠে সমস্ত বাড়ি।
বাগানে নিস্তব্ধ পাখির কোরাস। চামেলির ডালে বসা চড়–ই পড়ছে শ্লোক।
পায়রা, ঘুঘু, শ্যামা, দোয়েল- কোয়েল, হলদে শালিক, মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে
উড়ে উড়ে নিঝুম আকাশে চেয়ে আছে আপন মনে।
ফুটছে না অভিমানে কোনো জুঁই, শিউলি, বকুল,
ডাঁটা, পুঁই, কুমড়ো লতা, মাথা নত করে বসে আছে মনঃক্ষুণে।
উলুঝুলু বন আজ এলোমেলো, বৃষ্টির জল ফিকে হয়ে গেছে, ঝিঁঝির ডাক বেসুরা,
মৃদু গুঞ্জরণে বাহারি প্রজাপতি গুলো গড়াগড়ি খায় কুসুমের পাপড়িতে।
বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া কলতালহীন দীক্ষিত নদীর তরঙ্গমালা শোকাহত।
সমস্ত ঘর, সোফা, বেড, পালঙ্ক, অলিন্দ, কাঠ, লোহা-লক্কড় একে
একে চেয়ে থাকে
শেষ যাত্রার দিকে। অন্তরঙ্গ মেষ-বৃষগুলো চেয়ে থাকে বেদনার চোখে।
আমের বোলের সুঘ্রাণে ভরে আছে চারদিক।
হুতোম অলক্ষণী বিদঘুটে ভাষায় আবার কোরাস ধরেছে।

রেজওয়ান মারুফ

তিনি

যে চলে গিয়েও চলে যায় না
থেকে যায় বার বার
যার জন্যে গন্ধরাজ সাজে চোখে আদর দেয়া সফেদ রঙে
স্নিগ্ধ ভোরে প্রজাপতি  ম্লান করে সুবাসিত শিশিরের জলে।

তারই জন্যে তো খঞ্জনা গায়
সম্মোহনী সুরের সমবেত গীত
পায়ে ঘুঙুর বেঁধে বাতাস নাচে
ঢেউয়ের খাঁজ কাটা পথে পথে
মেঘেরা নির্মাণ করে আকাশের ঢালে শান্তির বাড়ি।

কিন্তু যখন বুকের আড়ৎ পরিপূর্ণ হয় দীর্ঘশ্বাসের তেজারতে
গৌরবের প্রান্তিক ম্লান করে দেয় রক্তের তেলচিত্র
সারেঙির কান্না দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে তখন।

আর আলোরা মরে যেতে যেতে বলেযায়
এই অচেনা আঁধার তাড়াতে তার বড় প্রয়োজন আজ।

 

 

এ কে এম আব্দুল্লাহ
আলোকিত উৎসব

রাতের শেষ পাতায় কলংকিত আঁধার
জ্যোৎস্নাবিহীন বিনাশের প্রচ্ছদ।
গভীর অন্ধকার থেকে উঠে আসা
চিহ্নিত খুনিরা আজ
তোমার মৃত্যুতে করে আনন্দ
মিথ্যে জন্ম লয়, মেতে উঠে অবৈধ উৎসবে।
একদিন তুমি যাদেরকে, নিজের রক্তের মত
ঠাঁই দিয়েছিলে বুকের ভিতর ;
বন্ধ্যা সময়ের রুঢ় পথে আজ–ওরা
ক্যান্সার হয়ে ছোবল মারে দেহে
মুছে দিতে চায় তোমার অস্থিত্ব।
জীবন ভুমিকায় তোমার প্রথম ক্রন্দন ধ্বনিতে
ছিলো জগতের শক্তি,নত হয়ে ছিলো
মায়ের প্রসব বেদনার চিৎকার।
তুমি ঘর আর ভোগ ছেড়ে এসেছিলে
এখানে মৃত্যুর মিছিলে,
আলোকিত উৎসব হবে বলে।

প্রবাসী কবি আসমা মতিনকে বাসিয়া প্রকাশনী সম্মাননা প্রদান করেছে

DSC_0135প্রবাসী কবি আসমা মতিনকে বাসিয়া প্রকাশনী গত ৩১ জুলাই সম্মাননা প্রদান করে। সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আমিনুল হক ভুইয়া। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাসিয়া প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, মাসিক বাসিয়া পত্রিকার সম্পাদক গীতিকার মোহাম্মদ নওয়াব আলী, বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের উপআঞ্চলিক পরিচালক আবদুল্লাহ মো. তারিক, কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ কবি ড. মোস্তাক আহমাদ দীন, কবি ও সাংবাদিক সাইদুর রহমান সাঈদ।

শাহ আব্দুল ওদুদের পরশমণি ঃ গানে গানে শুভ জাগরণ বার্তা শিউল মনজুর

111111111111গানের দেশ প্রাণের দেশ বাংলাদেশ। সুদীর্ঘকাল থেকে এ দেশের মানুষ প্রাণ দিয়ে গানকে লালন করে আসছে। গানের ভেতর দিয়ে সুখ শান্তি আশা আকাঙ্খার বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তেমনি মুক্তির প্রদীপ জ¦ালিয়েছে গানের মধ্যদিয়েই। যা আমরা ৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষভাবে অনুভব করেছি। এক কথায় ধনী গরিব, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক সমাজের সকল পেশার মানুষের মধ্যে চেতনার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে গান। আজকের প্রচার প্রসারের যুগে বিনোদনের নানা মাত্রা লক্ষ্য করি। কিন্তু হাটতে বসতে চলতে ফিরতে এখনও গান মানুষের বিনোদনের প্রধান উপকরণ। হাট ঘাট মাঠ সর্বত্রই গান, গানের জয়জয়কার। তবে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান এবং পীর সাধকদের পূণ্যভূমি হওয়ায় গানের মাত্রায় ভিন্নতা লক্ষ্য করি। এ ভিন্নতা হচ্ছে কথার, এ ভিন্নতা হচ্ছে সুরের, এ ভিন্নতা হচ্ছে আঞ্চলিক সংস্কৃতির। শাহ আব্দুল ওদুদ রচিত পরশমণি গানের বইতে আমরা সেই ভিন্ন ধারা লক্ষ্য করি।
সিলেটের প্রথম মুসলমান হযরত শাহগাজি সৈয়দ বুরহান উদ্দিন (র.), সৈয়দা মা জননী (র.) ও শহিদ সৈয়দ গোলজারে আলম (র.)-কে উংসর্গিত বইটির নামকরণের সাথে মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুভাষ চন্দ্র নাথ এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬ সালে প্রকাশিত এই পরশমণি বইটির প্রকাশক সিলেট তথা বাংলাদেশের সু পরিচিত প্রকাশনা সংস্থা বাসিয়া প্রকাশনী। বইটির বাজার মূল্য উল্লেখ রয়েছে ১৫০ টাকা। ৬৮ পৃষ্টার এ বইটিতে গান রয়েছে ৫৭টি।
এই ৫৭টি গানের মধ্য দিয়ে তিনি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি অসীমভক্তি, দেশের প্রতি দেশের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিবেদনসহ আলোকিত সমাজগড়ার জন্য শিক্ষার প্রতি অনুরাগ, মানবতার কল্যাণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানব আত্মার মুক্তি সর্বোপরি জীববোধের উচ্চারণ উদ্ভাসিত হয়েছে। গানের পঙক্তিমালায় কিংবা তার শাখা প্রশাখায় সারল্যের গতি প্রবাহমান। গ্রন্থভূক্ত গানের মধ্যে কখনো অক্ষরবৃত্তের আবার কখনো স্বরবৃত্তের দোলা অনুভব করা যায়। একজন পল্লীগায়ের সাধারণ শিল্পী থেকে শুরু করে আধুনিক শহরের শিল্পীরাও স্বাচ্ছন্দে তাঁর গান পরিবেশন করতে পারবেন। সেই সাথে বলা যায়, গানে গানে যে ম্যাসেজ বা বার্তা গীতিকার দিয়েছেন তাও পাঠক-শ্রোতারা সহজেই আত্বস্থ করতে পারবেন। এখানে পাঠক-শ্রোতাদের জন্যে পরশমণি থেকে পাঁচটি গানের অংশ বিশেষ উল্লেখ করা হলো;
এক) সারা জাহান হয় উজালা দয়াল নবীর রহমতে
আওরে আসিক দলে দলে রওজা শরীফ জিয়ারতে।।
… … … … … …
রওজা শরীফ করিলে তোয়াফ
গোনা কছুর হয় যে মাফ
কুদরতি সাবানে ছাক
আল্লা তালার বরকতে।। (পৃষ্টা-৮)

দুই) জন্ম আমার বাংলাদেশে
ধন্য তারে ভালোবেসে
জীবন কাটাই হেসে হেসে, হাসি অনিঃশেষ।।

টিয়া, ময়না, দোয়েল, কোকিল
ঘুঘু, বুলবুল, মাছরাঙা, চিল
নদীনালা অসংখ্য বিল সুন্দর পরিবেশ।। (পৃষ্টা-১৭)

তিন) শাহজালাল বাবারই গুণে
ধন্য এই সিলেটের মাটি
আধ্যত্মিক রাজধানী খ্যাত
অমূলক নয় এই কথাটি
ধন্য এই সিলেটের মাটি।। (পৃষ্টা-১৯)

চার) ফুটলরে ইসলামের ফুল
সিলেটের হাটে মাঠে
গৌড়গোবিন্দ পরাজিত
জালাল বাবার দাপটে।।

রইল না আর কুসংস্কার
দীন ইসলাম হইল প্রচার
যার উছিলায় পাইলাম দিদার
দয়াল বাবার নিকটে।। (পৃষ্টা-২১)

পাঁচ) শ্রদ্ধা জানাই শহিদ যারা
যাদের জন্যে দেশ পেয়েছি মোরা
দেশ প্রেমিক ছিল যারা
তাদের দয়ার দান।।

সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার
পদে পদে ছালাম সবার
কয় আব্দুল ওদুদ গোনাগার
চরণ তলে মা দিও স্থান।। (পৃষ্টা-২৬)

আমি মনে করি গীতিকারের ৫৭টি গানই উল্লেখযোগ্য অর্থ্যাৎ প্রশংসার দাবী রাখে। কেননা প্রতিটি গানের মধ্যদিয়ে সুস্থ সমাজ গঠনের শুভ জাগরণ বার্তা রয়েছে। এমন একটি গানের বই জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদ নির্মূলেও ভূমিকা রাখতে পারে। বলা যায়, প্রকাশক নওয়াব আলী একটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেছেন। বইটির টেকশই বাঁধাই ও পরিচ্ছন্ন ছাপা আমাদেরকে বইটি হাতে নিতে প্রলুব্দ করে। গান লেখা সহজ কাজ নয়। গান লিখতে হলে গানের মধ্যেই অবিরাম বিচরণ করতে হয়। গীতিকার প্রাণের তাগিদে আমাদেরকে যে গান উপহার দিয়েছেন, তা আমাদের গানের জন্যে অমূল্য সম্পদ। তাঁর এই গান গুলি বর্তমান সময়ের জন্যই নয়. ভবিষ্যত প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি মনে করি। মরমী কবি হাছন রাজা, দুর্বিণ শাহ, আরকুম শাহ, রাধারমণ, বাউল স¤্রাট আব্দুল করিমের উত্তরসূরি গীতিকার শাহ আব্দুল ওদুদও সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবেন বলে আশা করা যায়। তাঁর রচিত সমগ্র গান সেই ইঙ্গিতই আমাদেরকে দিচ্ছে।

শিউল মনজুরঃ কবি ও কথাসাহিত্যিক।

Developed by: