বিভাগ: বই পত্র

সুর : শেখ মুজিবুর ।। আতাউর রহমান আফতাব

কাব্যগ্রন্ত্রটি লিখেছেন বাংলা সাহিত্যর বিশিষ্ট কবি দিলওয়ার। প্রচ্ছদ- ধ্রæব এষ, সাদা-কালো মোড়কে গ্রন্থটি সাজানো হলেও আকর্ষণীয়, আভিজাত্যের প্রতিফলন রয়েছে। প্রকাশক- বাসিয়া প্রকাশনী, সামসুদ্দীন হাউস, স্টেশন রোড, সিলেট। মূল্য- ২২৫ টাকা, প্রকাশকাল- অমর একুশের বইমেলা- ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।
কবি দিলওয়ার ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। কবির অন্তর্দানের ৭ বছর পর বইটি প্রকাশিত হয়। মোট ৯০টি কবিতা এ গ্রন্থে স্থান লাভ করেছে। গ্রন্ত্রটিতে রয়েছে ২১টি সনেট। সনেট রচনায় কবি দিলওয়ারের সাফল্য ও দক্ষতা যে কেউ স্বীকার করবেন।
বইটির ভূমিকা লিখেছেন কবির
সূযোগ্য পুত্র কামরান ইবনে দিলওয়ার। গ্রন্ত্রটির নাম কবিতা- ‘সুর : শেখ মুজিবুর’। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রথম কবিতা এবং শেষ কবিতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সাম্যবাদী, গরিব-দুঃখী, মেহনতী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে নিয়ে সুখী ও সমৃদ্ধশালী জীবনের স্বপ্ন দেখতেন তা কবি দিলওয়ারের ভালোই জানা ছিল। কবি দিলওয়ার পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মনিষী, রাজনীতিবিদ ও কবি সাহিত্যিকবৃন্দ নিয়ে জীবনে গবেষণা করেছেন। উক্ত গ্রন্থেও তাদের বিষয়ে অকুণ্ঠচিত্তে লিখে গেছেন কবি দিলওয়ার।
স্বদেশ ও স্বজাতীয় চেতনায় জীবনে বারবার দোলায়িত কবি বঙ্গবন্ধুকে উক্ত গ্রন্থে যেন নায়কের ভূমিকায় তুলে ধরেছেন। ‘সুর : শেখ মুজিবুর’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরছি-
‘দেশ যদি বৃক্ষ হয়, তুমি তার প্রণেতা শিকড়
তোমাকে রেখে তাই যারা ঋদ্ধ হতে চায়
বিভ্রান্ত বিশ^াসে তারা হৃদপিন্ডে বৃদ্ধ হতে চায়।
বড় মর্মান্তিক সেই বিচারক কালের আঁচড়।’

‘প্রতিদিন পত্রিকায়’ নামক কবিতা থেকে-
‘আমাকে বলতে দিন সম্মানিত মহোদয়গণ
প্রতিদিন দুঃসংবাদ ছাপা হয় কত?
আমাকে বলতে দিন কত হয় আহত নিহত?
উন্মাদ আশ্রমে আছি এই বোধে কাঁদে কেন মন?

প্রতিদিন পত্রিকায় স্বদেশের আর্তদান শুনি
ছুটছে মাতাল তরী, দৈবাকাশে ঝাঁকের শকুনি।’
‘প্রিয় সম্পাদক’ নামক কবিতায় কোন প্রিয়জন সম্পাদকের উদ্দেশ্য কবি দিলওয়ারের কবিতা দেশ ও জাতির প্রতি ভালোবাসার চরম অভিব্যক্তি। যেমন-
‘প্রিয়জন সম্পাদক
বন্ধুজন তুমি
সমস্যা সংকুল দেশে
দৃষ্টি নিষ্পলক।
জানতে চাইবো না আমি
এই দেশে কবে
মুক্তি যুদ্ধ হয়েছিল
মুক্তিপক্ষ পাখির গৌরবে
বলবো না কত রক্ত
রূপ নিল কলঙ্ক কালিতে

আমাতে নৈরাশ্যবাদ
আজন্মই রয়েছে নিখোঁজ
চিরায়ত আলোবায়ু
আমাকে যোগায় রাজভোজ

তাই আমি প্রিয় সম্পাদক
তোমাকে একান্ত চাই রশ্মির কনক
কলমে ছড়াও তুমি
খুলে ধরো প্রাচীন প্যাপিরাস
জ্ঞাত হোক জনশক্তি
কী করে ঘটলো সেই দুর্বোধ্য প্রজ্ঞার সুপ্রকাশ।’
২০০৫ সনের জুন মাসে লিখিত কবিতায় কবি দিলওয়ারের বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সুর তারণ্যের চেতনায় উদ্ভাসিত। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া সে ধরনের ভাব, ভাষা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা প্রকাশ দূর্লভ।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (বর্তমান) অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবির একটি কবিতার অংশ বিশেষ-
তুমি ভুলে গেছো নারী একদিন শিকারী আমাকে
ঘরমুখো করেছিল যৌথভাবে ধানের আবাদে,
সেই কাল খৃষ্টপূর্ব দশ হাজার বছর হল যে!
যদিও তখনো প্রিয়া উঠেনি নোলক তোর নাকে,’
¯েœহ, প্রেম, প্রীতি, আকর্ষণ নারী পুরুষের স্বভাবজাত। ধর্মের বন্ধনে আমরা সংসার গড়ি। নারী পুরুষের মিলনে
হয় সৃষ্টি। কবি সেখানে স্বামী স্ত্রীর প্রেম, মিলন, ভালবাসা
তথা প্রকারান্তরে ধর্মের জয়গান গেয়েছেন। যেমন-
‘ধ্রæপদী আকাশ দেখো পূর্বেকার আদিম নয়নে
তারপরে যাব জুটি সভ্যতার কুসুম কাননে।’
(ধ্রæপদী আকাশ দেখা)
কবি দিলওয়ার তাঁর‘ সুর : শেখ মুজিবুর’ কাব্যগ্রন্ত্রে পৃথিবীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে টেনে এনেছেন। যেমন- কাজী নজরুল ইসলাম,রবীন্দ্রণাথ ঠাকুরম গ্যেটে, সক্রেটিস, এরিষ্টটল, প্লেটো, হোসিয়ড, পিন্ডার, হোমার,
ঈশপ, সফেক্লিস, আলেকজান্ডার, ভার্জিন, দ্বৈপায়ন, ফেরদৌসী, দান্তে, বাল্মিকী, মিল্টন, সেপিয়র, কার্ল মার্কস, স্পার্টাকাস, লিওর্নিদাস, লেনিন, মাওসেতুং, হোচিমিন, আরনেস্টা, চেগুয়েভারা, বেঞ্জামিন জেফানিয়াহ প্রমুখ কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদগণকে তুলে ধরেছেন। এমনকি সিলেটের কৃতি সন্তান রাজনীতিবিদ পীর হবিবুর রহমানকে নিয়েও কবিতা লিখেছেন। তাতে প্রমাণিত হয় কবি জীবনে বিশে^র বিভিন্ন ধর্ম, বিশ^ভ্রহ্মান্ড, দর্শন, সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র, বিপ্লব, জাতিতত্ত¡, সবকিছু নিয়েই গবেষণা করেছেন।
‘২২ শে শ্রাবণ’ নামক কবিতায় কবি লিখেন-
‘রবীন্দ্রনাথ, আজ ২২শে শ্রাবণ ১৪০৮
এমনি এক বর্ষাকালে তোমার সর্বশেষ
শরীর সর্বস্ব পরিচিতি
তোমার বিশাল রচনা সম্ভারে
কালের অশ্রæ হয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ, তুমি সত্যি ভাগ্যবান
বেঁচে থাকলে বিক্ষুদ্ধ বিস্ময়ে নীরিক্ষণ করতে
তোমার লেখা জাতীয় সংগীতে
কী নান্দনিক রক্তকরণ।’
কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে ‘নজরুলের কৈফিয়ত ডাকে’ কবিতা থেকে-
‘কোথায় যাচ্ছো, তুমি
নজরুলের কৈফিয়ত ডাকে,
তোমার কী কৈফিয়ত
কহে দ্রোহী দৃষ্টি মৌচাকে,

শিকল পড়ার ছল… দেখো তুমি
সত্য হয়ে যায়,
কবিতা ‘বিদ্রোহী’ দিক চূর্ণ করে
সব অন্তরায়।’
কবি দিলওয়ারের চোখে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাই সব বাধা, ভেদাভেদ, ভন্ডামীর আসল মুখোশ উন্মোচিত করে, যা কোন দিন কেউ করেছে কি না, আমাদের জানা নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গ্রন্থের শেষ কবিতা। কবি দিলওয়ারের লেখায় বঙ্গবন্ধু বিভিন্নভাবে বিভূষিত হয়েছেন। যেমন-
‘বঙ্গবন্ধু তোমার জন্মদিনে
নিপীড়িত আর শোষিত মানুষজন
নব জীবনের বিপ্লব নিক চিনে…

তোমার জবানে কথিত চার্টার দল
লোহিত সাগরে মিটাক কৌতূহল,
ঝরাক পশুরা মরণাস্ত্রের ঋণে,

মুক্তিযোদ্ধা ফিনিক্স পক্ষী হবে,
গণমানবিক দুরন্ত গৌরবে।
সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল কবি দিলওয়ারের, ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি’ কাব্যগ্রন্থ পাঠ করলে তা অনুমান করা যাবে।
আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় কাব্যগ্রন্থ ‘সুর : শেখ মুজিবুর’। কবি দিলওয়ারের লিখায় ও চেতনায় বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবুর রহমান এদেশের জাতীয় নায়ক, দেশ জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু।
পরিশেষে আমরা পরপারে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জানাই অশেষ শ্রদ্ধা এবং কবির প্রতি মেবারকবাদ।

সিলেট বিভাগের ঠিক মধ্যবিন্দুতে, মহাভারতে বর্ণিত প্রাচীন বরবক্র (বরাক) নদীর তীর ঘেষে, বরাকের শাখা নদী ও তৎপার্শ্ববর্তী হাওড়সমূহের চতূস্পার্শ্বে গড়ে ওঠা জনবসতি, বর্তমান জরিপী ১৪৪টি মৌজায় ২৯৩ গ্রাম ২২৪.৫৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট, ২০১৫ সালের হিসাবানুযায়ী ২,৩০,৪৬৭ জন জনসংখ্যা সম্বলিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ যা ‘ওসমানীনগর উপজেলা’ নামে পরিচিত।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, সাদীপুর ইউনিয়নের শেরপুর থেকে দয়ামীর ইউনিয়নের আহমদনগর এবং কুশিয়ারা-বিবিয়ানার নাব্য নদীপথ ও পরবর্তীতে নৌ ও স্থল যোগাযোগ এ অঞ্চলকে পাশর্^বর্তী জেলাসমূহ তথা সারা দেশের সাথে প্রাচীন নৌ ও বর্তমান সড়কপথে সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে এবং সিলেট বিভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে থাকার সুবাদে এ অঞ্চল বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতি-সংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে বরাবরই খ্যাতি লাভ করে আসছে।
এর উত্তরে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা ও বিশ^নাথ উপজেলা, দক্ষিণে কুশিয়ারা নদীর ওপারে মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা, পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর আর পূর্বে বর্তমান বালাগঞ্জ উপজেলা। সূদুর অতীত কাল থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বৃহত্তর সিলেটের ভাঙা-গড়া, বৌদ্ধ সংষ্কৃতি, অগ্রহার, ব্রাম্মণ্য বসতি ইত্যাদি অতি নিকট থেকে অবলোকন করেছে এ অঞ্চল এবং প্রভাবিতও হয়েছে সময় সময়। প্রাচীন গৌড়-লাউড় ও দক্ষিণ সিলেটের সীমানা বেষ্টিত এ অঞ্চলটি প্রাচীন গৌড় রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। হযরত শাহজালালের (র.) গৌড়বিজয় কালে তাঁর প্রথম পদস্পর্শে ধন্য হয়েছে এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষ। এ অঞ্চল তাই তার প্রাচীনত্ব ছাড়াও ইতিহাসের বিভিন্ন ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন ও বহুমূখী বিনির্মাণে রেখেছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

মাতা পিতা একসময় ছিলেন নিজের ঘর-পরিবারের নির্মাতা, সংসার-সমাজের প্রতিষ্ঠাতা। অথচ কালের বিবর্তনে কিছু সংখ্যক হয়েছেন অকর্মণ্য, নিজের ঘরে পরগাছা, সন্তানের চক্ষুশূল এবং পরিবার ও সমাজের বোঝাস্বরূপ।
অথই জলে ভাসমান কচুরিপানার মতো দুর্বিষহ অবস্থা বহে চলে তাদের উপর দিয়ে। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের হাতে গড়া পরিবার বা সংসারে হয়ে পড়েন এক প্রকার বন্দি কিংবা অপাংক্তেও।
অথচ মাঠে-ময়দানে খুব জোরেসোরে শোনা যায় যে, ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। কিন্তু এই কথা কেউ স্পষ্ট করে কিংবা জোর দিয়ে বলে না যে, ‘আজকের প্রতিষ্ঠা কেবল গতকালের কষ্টের ফসল’। অর্থাৎ গতকাল যারা কষ্টেসৃষ্টে দিন-রাত পরিশ্রম করে সমাজকে ‘আজ’কে পৌঁছে দিয়েছে, তারা হলেন পিতা মাতা। আজকের সমাজের বৃদ্ধ মানুষেরা। আজকের এই বৃদ্ধরাই একসময় ছিলেন সমাজের ভবিষ্যৎ ও কর্ণধার।
বৃদ্ধগণের প্রতিপালনের ক্ষেত্রে ছেলে-সন্তানদের ঘর-সংসারে লেগে থাকে ভুল বোঝাবুঝি ও ঝগড়া-বিবাদ। অনেক ছেলের বউ তার শ্বশুর-শাশুড়িকে গ্রহণ করতে পারে না নিজের মা-বাপের মতো।
উপরন্তু তারা বৃদ্ধ পিতা মাতার পরিচর্যাকে আরেকটি বাড়তি ঝামেলা মনে করে।
আজকাল অধিকাংশ বৃদ্ধ পিতা মাতা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার- যেটা ধ্র“বতারার মতো সত্য।
কোনো কোনো পরিবারে বৃদ্ধ মানুষের জন্য দিন-রজনির সিংহভাগ সময় ব্যয় করতে হয়, যার পুরোটাই পণ্ডশ্রমতুল্য।
ফলে ইসলামি শরীয়ত, বিধি-বিধান, হালাল-হারাম ইত্যাদির তোয়াক্কা না করেও আষাঢ়ের কদম ফুলের মতো দিকে দিকে গড়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রম। এ সকল বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছেন সমাজের অসংখ্য বৃদ্ধ মানুষ। অনেক বৃদ্ধ পিতা মাতা ছেলে-সন্তান থাকা সত্তে¡ও বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা হতে বাধ্য। ওইসব সভ্যতার কোনো কিছু না হলেও সমাজের রুঢ় বাস্তবতা।

ইসলাম ও আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা ।। কানিজ আমেনা

আবদুল মুকিত মুখতার। যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক সাংবাদিক। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নিরলস চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এ পর্যন্ত তার ১০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘ইসলাম ও আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা’ তার একাদশ বই। বর্তমান সময়ে ইসলাম ও এ সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের উপর কলম ধরা চাট্টিখানি কথা নয়। হৃদয়ে ক্ষণিকের আবেগ চলে এলো আর লিখে ফেললাম দু লাইন- ইসলাম বিষয়টি এমন নয়। কবিতার ক্ষেত্রে হয়তো কেউ কেউ মনে করতে পারেন এ কথাটি প্রযোজ্য নয়। কারণ কবিতা তো আবেগ দিয়ে লেখা হয়। কিন্তু ইসলাম বিষয়ক কোনো কবিতা লিখতে গেলেও উপরোক্ত কথাটি প্রযোজ্য। আবেগের বশে এমন কিছু কবিতার ছত্রে লেখা যাবে না যা শিরকের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়। আর গবেষণাধর্মী কোনো প্রবন্ধের ক্ষেত্রে তো আবেগ বলতে গেলে পুরোপুরি বর্জনীয়। যে বিষয় নিয়ে লেখা হবে, সেই বিষয়ের উপর প্রচুর পড়াশোনা, অধ্যয়ন ও গবেষণা করে তবেই কলম ধরতে হয়। আর সেই দুঃসাহসিক, কষ্টসাধ্য ও পরিশ্রমসাপেক্ষ কাজটিই করে দেখিয়েছেন লেখক আবদুল মুকিত মুখতার।
বইটি পড়তে যাওয়ার আগেই বইয়ের আয়তনের দিকে এক পলক নজর বুলালেই যেকোনো যেকোনো পাঠক এটি সহজে অনুমান করতে পারবেন।
লেখক বইটিকে তিনটি অধ্যায় বিভক্ত করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে যেসব বিষয়ের উপর আলোচনা করেছেন তার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য শব্দ হচ্ছে- মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজ্যবাদ, বিশ্বব্যাংক, সন্ত্রাসবাদ, আরব লীগ ও আইসি, ওরিয়েন্টালিজম, ক্রুসেড ও মিডিয়ার ভূমিকা ইত্যাদি। এছাড়াও প্রসঙ্গক্রমে একজন সাহাবীর কথাও এসেছে। তিনি সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর মর্যাদার উপরও আলোকপাত করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায় আরও বিস্তৃতভাবে এসেছে। এই অধ্যায়ে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তার কিছু উদাহরণ হলো- খিলাফতে উমাইয়া, খারিজী বিদ্রোহ, উটের যুদ্ধ, সিফফিন যুদ্ধ, তাহরীফ এবং তাবীল, খিলাফতে আব্বাসীয়া, ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থা, ইয়াহুদীবাদ, গেøাবালাইজেশন, ফরাসী বিপ্লব, তুরস্কের উসমানীয়া খিলাফত ইত্যাদি। এ ছাড়াও যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিতের আলোচনা এসেছে তারা হলেন তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.), ইমাম হাসান (রা.), ইমাম হুসাইন (রা.), মুআবীয়া (রা.), ইয়াযীদ, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, উমর ইবনে আবদুল আযীয (রা.), সাদ্দাম হোসেন।
তৃতীয় ও সর্বশেষ অধ্যায়ের অর্ধেক অংশে এসেছে উপমহাদেশের ইতিহাস। যেমন- মোঘল সম্রাট, সম্রাট আকবর, সম্রাট জাহাঙ্গীর, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের জন্ম, ভারত ও বাংলা অঞ্চলে আইনী জটিলতা ইত্যাদি। বাকি অর্ধেক অংশে এসেছে আফগানিস্তান ও রাশিয়ার ইতিহাস। যেমন- আফগানিস্তানে খিলাফত ও তালিবানী চমক, রুশ ভল্লুকের আফগান দখল, আশির দশকের আফগান জিহাদ, বর্তমান আফগানিস্তান, তালিবান বিপ্লব, মোল্লা ওমর, বহির্বিশ্বের শত্রুতা ও তালিবান শাসনের সম্পর্ক ইত্যাদি। এছাড়াও উপসংহারে ইসলামের চারজন খলিফার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। সর্বশেষে কুতুবে আলম মাদানী (রহ.)-এর চল্লিশটি বাণী সন্নিবেশিত হয়েছে।
যদি ও বইটি আকারে বিশাল তবু পড়তে বসলে জ্ঞানপিপাসু পাঠক তা সম্পূর্ণ শেষ না করে উঠতে পারবে না বলে আমার বিশ্বাস।
ইসলাম ও আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার মতো বিশাল আকারের এই বইটি প্রকাশনার দায়িত্ব নেয়ার মতো সাহস দেখিয়েছেন সিলেটের অগ্রসরমান প্রকাশনীগুলোর অন্যতম বাসিয়া প্রকাশনী। প্রথম প্রকাশ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০, দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০২০। পৃষ্ঠা ৬৩২। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৮০০ টাকা, প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেলোয়ার রিপন।
লেখক আবদুল মুকিত মুখতার প্রচুর সময়, ধৈর্য ও শ্রম বিনিয়োগ করে এমন একটি মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ বই পাঠক সমাজকে উপহার দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে এই কাজের সর্বোত্তম প্রতিদানে ভূষিত করুন এই কামনা।

কৃষ্ণপক্ষের কবিতা ।। সুমন বনিক

করোনা নামক অতিমারি তাবৎ দুনিয়ায় বাসা বেঁধেছে প্রবল আক্রোশে। বুকের পাজরে, চোখের কোঠরে ভয় এসে দানা বাঁধে তিলে তিলে। এক আজানা ব্যাধির হিংস্র থাবায় অসহায় পৃথিবীর মানুষ। শ্লথ হয়ে পড়ে জীবনের গতিধারা, সভ্যতার রথ। ফিকে হয়ে যায় মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। এরকম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেও কবি তাঁর কাব্য সুষমার বাতায়ন খুলে বসেন। ভয়-শংকাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সৃষ্টির নিমগ্ন সাধনায় ব্রতী হন। এই করোনাকালে কাব্যরচনায় কবি এ কে শেরাম জীবন উদযাপনে মেতে ওঠেন চারদেয়ালের প্রকোষ্ঠে। জয় করেন প্রতিটি অপম্রিয়মাণ মুহূর্ত। তাঁর রচিত কৃষ্ণপক্ষের কবিতা বইটি করোনাকালের সময়কে ফ্রেমবন্দি করেছে। কবি অতিমারির বিষাদময়কালকে কবিতায় মলাটবদ্ধ করে মহাকালের হাতে তুলে দেয়ার প্রয়াস খুঁজেছেন।
কবি এ কে শেরাম কবিতাররাজ্যে অবিশ্রান্ত ও অভিজাত অভিযাত্রী। তাঁর কবিতা দিবালোকের মতো সহজ, চাক্ষুষ সুন্দর। তাঁর কবিতায় ভাবুক ধ্যানের প্রকাশ স্বচ্ছতা, কাল-যুক্ততা, নির্মাণকলার মুন্সিয়ানা তাঁকে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে।
তাঁর কৃষ্ণপক্ষের কবিতা বইয়ে হƒদয়ের গহিন থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে এনেছেন বিষাদের নীলরং, ভালোবাসার আবির, আর বেঁচে থাকার শস্যদানা। বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন মহামারির করাল গ্রাসে পতিত হয় অসংখ্য জীবন। করালে মৃত্যু তার অশুভ ছায়া মেলে দেয় আমাদের ওপর; দুঃখ-কষ্ট, অসহায়তার আর্ত-হাহাকারে ভারি হয় আকাশ-বাতাস, পরিবেশ ও প্রতিবেশ। সবকিছু দেখে দেখে ক্লান্ত-বিষণœ মনে বেদনার হাহাকারগুলো বাণীবদ্ধ করি কবিতার আঙ্গিকে। কৃষ্ণপক্ষের এইসব চূর্ণক ভাবনা তাঁর কবিতায় কল্পনার আধার হয়ে উঠেছে। গ্রন্থাশ্রিত কবিতাসমূহ থেকে কয়েকটি কবিতা পড়ছি-
কোয়ারেন্টাইন জীবন
আমার এখন দিন শুরু হয় রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে।/ সকাল দেখি না আমি,/ সকালের সোনালি রোদের স্নিগ্ধ রেণু/ শরীরে মাখিনি অনেকদিন,/ ভোরের বাতাসের সুশীতল ধারাজলে/ মুখ ধোয়া হয় না আমার।/ ঘুম থেকে উঠেই বসে যাই ক্লান্তির প্রাতরাশ নিয়ে,/ সামনে তখন টিভির নিউজ চ্যানেলে/ পপকর্ণের মতো ফটফট ফুটতে থাকে অসংখ্য শব্দ,/ প্রচারিত হতে থাকে চলমান সংকটের সচিত্র প্রতিবেদন।/ মনঃসংযোগ নেই কোনো কিছুতেই,/ মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করি/ বেখেয়ালে ঘুরাঘুরি করি ফেবুর পাতায়;/ কতজন কতকিছু লিখে/ প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানা বিষয় নিয়ে;/ নিজেও অনেক হাবিজাবি লিখি।/ এইসব করে করে ক্লান্ত হই,/ এক বিপন্নতার বোধ কেবল কাজ করে যায় গোপনে গোপনে।/ রাতে, বিবমিষা জাগানো মন নিয়ে,/ বিরক্তির বিছানায় শুয়ে শুয়ে দুঃস্বপ্ন দেখি।/ ছটফট করি, নানা উল্টোপাল্টা ভাবি,/ ঠিকমতো ঘুমও আসে না,/ কেবল প্রতীক্ষায় থাকি/ কখন পোহাবে এই দুঃস্বপ্নের রাত।
কবি দুঃস্বপ্ন রাত পোহানোর অপেক্ষায় ছটফট করছেন। গোটা দুনিয়ায় মানুষের মনে আতঙ্কের যে ছটফটানি তা যেন কবির মনেও সঞ্চারিত হয়েছে। কবি ফররুখ আহমদের সেই পাঞ্জেরী কবিতার আকুতি ‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী।’ কবি তাই বিবমিষা জাগানো মন নিয়ে দুঃস্বপ্ন রাত কাটাচ্ছেন।
মানুষের মৃত্যু নেই
আমরা দেখেছি,/ মারিতে-মড়কে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে,/ অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয় বারংবার;/ তবু মরে না মানুষ।/ মৃত্যুকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে সে।/ পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো/ বারবার সে জেগে ওঠে ভস্মস্তূপ থেকে।/ আসলে,/ মানুষের মৃত্যু নেই;/ অজস্র অসংখ্য মৃত্যুতে বরং সে অমরতা পায়।
মানুষের মৃত্যু নেই এ যেন কবির দার্শনিক উক্তি। আদতে মানুষের মৃত্যু নেই। বরং মৃত্যু মানুষকে অমরতা দান করে। গীতার সেই বাণী জাতস্য হি ধ্রুবমৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ। অর্থাৎ, যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। এই কবিতায় একটি আধ্যাত্মিক দর্শনের রসাস্বাদন করতে পারি। ব্রিটিশ কবি জর্জ হার্বার্টের কবিতায় আমরা আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে কাব্যের সংশ্লেষ পড়ে মুগ্ধ হই, প্রাণিত হই। আমাদের মন ভিজে যায়। কবি এ কে শেরাম তেমন করেই যেন তাঁর এই কবিতায় পাঠকের মন ছুঁয়েছেন।
আছি প্রতীক্ষায়
এখন আমার স্পর্শের যোগ্য কেউ নেই এ পৃথিবীতে,/ এমনকি তুমিও না।/ এখন সবাই অস্পৃশ্য, যেন অশুচি তারা;/ সবাই এখন দূরে দূরে থাকে/ দূর আকাশের তারার মতো।/ আমাদের মধ্যে সম্পর্কের এই নতুন মেরুকরণ/ সৃষ্টি করেছে এক অচেনা-অদেখা শত্রু।/ তাই কেবল প্রতীক্ষায় আছি/ সকলের সাথে/ তুমিও আবার কবে শুচি-শুভ্র সৌন্দর্যে জেগে উঠবে,/ কবে আবার তুমি স্পর্শযোগ্য হবে,/ হবে আগের মতো আবার একান্ত আপনার।
ধ্যানমগ্ন কোনো এক আর্য ঋষির মতো প্রতীক্ষায় আছেন কবি শুচি-শুভ্র দিনের জন্য। সুদিন ফিরে আসবে, পৃথিবীর ফুলেরা হেসে উঠবে। কবি স্পর্শ পাবেন প্রিয়মানুষের। কবি শুদ্ধতার অভিসারী। কবির হƒত হƒদয়ের আর্তনাদ এবং প্রণয়কাতর পাঠক হƒদয়ের হাহাকার; একাকার হয়ে আছে এখানে।
ভালো নেই
ভালো নেই।/ ভালো নেই মন/ ভালো নেই এ জীবন,/ ভালো নেই চেতনার সকাল/ ভালো নেই এই করোনারকাল।/ ভালো নেই এ-পৃথিবী আজ ভালো নেই/ ভালো নেই বিষাদে-বেদনায় তার মন ভালো নেই।/ ভালো নেই বিশ্বের তাবৎ মানুষ ভালো নেই।/ ভালো নেই বাতাস, এই সুনীল আকাশ,/ ভালো নেই গান, ফুলের বাগান,/ ভালো নেই কবিতা ও কবি/ ভালো নেই শিল্পীর ছবি,/ ভালো নেই কিছু,/ ভালো নেই।
কবির এই ভালো নেই কবিতাটি পড়লে, ব্রিটিশ কবি জর্জ হার্বাটের কবিতার শরীর কাঠামোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ব্রিটেনের ওয়ালসে ১৫৯৩ সালে জন্ম নেয়া এই কবিকে ইংলিশ রিলিজিয়াস কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর কবিতায় প্রভু যিশুর পুনরুত্থানের মহিমাবার্তা বিকশিত হয়েছে। কবি এ কে শেরাম তাঁর ভালো নেই কবিতায়, মানুষের ভালো না-থাকার নানান অনুষঙ্গ তুলে এনে সেই কষ্টে জর্জরিত মানুষের বার্তা ¯্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। কবিতার দৈহিক গঠনে হার্বাটের কবিতার সাযুজ্য কিছুটা খুঁজে পাই।
কবি এ কে শেরাম বইতে বিষাদের মাঝে জীবনের রং ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন। ভালোবাসার প্রণয়ের কৃষ্ণচূড়া রং মেখেছেন কিছু কিছু কবিতায়। চুম্বনের অধিকার, পরকীয়া, তবুও ভালোবাসা, বদলে যেও না তুমি ইত্যাদি কবিতা হƒদয় জুড়ে কেবলই মুগ্ধতা ছড়ায়। এই গ্রন্থে তাঁর কবিস্বরূপ নিন্দিষ্টতা ও স্বকীয়তা অর্জন করেছে বলে মনে করি। তাঁর কবিতা পরিশীলিত পাঠককুলের হƒদয় স্পর্শ করতে পারবে নিশ্চয়ই। কবির প্রজ্ঞাময় মঙ্গলপ্রত্যয়ী কবিতার পঙক্তি আমাদেরকে বেঁচে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।
কৃষ্ণপক্ষের কবিতা বইতে সর্বমোট চৌষট্টিটি কবিতা ঠাঁই পেয়েছে। আশি পৃষ্ঠার বইটি বাসিয়া প্রকাশনী বের করেছে। মূল্য রাখা হয়েছে একশো পঞ্চাশ টাকা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেলোয়ার রিপন। কবি বইটি উৎসর্গকৃত করেছেন কবি আবিদ ফায়সালকে। কৃষ্ণপক্ষের কবিতা বইটি প্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হবে নিশ্চয়ই। জয় হোক কবি এবং কবিতার । পৃথিবী নিরাময় হোক।

স্মৃতির ডায়েরি।। রেজুয়ান চৌধুরী

কবিতা-গান যুগ যুগ ধরে মানুষের প্রেরণা, শক্তি-সাহস যুগিয়ে আসছে। নৈশব্দিক একাকিত্বে গান কবিতা নির্মল প্রশান্তির অমূল্য উপকরণ হয়ে একাকিত্বের অবসান ঘটায়।
সৃষ্টির মাঝে যারা জীবনের খোঁজ করে তাঁরাই কবি। প্রকৃতির নানান অপরূপ কারুকার্যের মাঝে মোহনীয় আবেশে দোলে ওঠে কবিমন, এই দোলা ছন্দ হয়ে ঝরে পড়ে এক একটা কবিতা হয়ে। কবিতায় কবিমনের ভাবের পাশাপাশি ফুটে উঠে জীবনমুখী শৈল্পিক আবেদন, তাই তো কবিরা ছন্দশিল্পী।
এমনই এক ছন্দশিল্পী কবি রেজুয়ান চৌধুরী। তাঁর ‘স্মৃতির ডায়েরি’ কাব্য গ্রন্থের প্রত্যেকটা কবিতায় অসাধারণ ছন্দ ও নান্দনিকতা লক্ষ করার মতো যা একজন গুণী কবির পক্ষেই সম্ভব এবং এ কাজটিই করে দেখিয়েছেন কবি রেজুয়ান চৌধুরী।
‘স্মৃতির ডায়েরি’ কাব্যগ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ৫৫ টি কবিতায় সহজ সরল পরিশীলিত প্রাঞ্জল ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যা গুণে-মানে ও রসবোধে অনন্য বিধায় সব শ্রেণির কাব্যরসিক পাঠক মনের ক্ষুধা মেটাতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।
অসাধারণ এই রচনার জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে কবিবন্ধুকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন, সেই সাথে ‘স্মৃতির ডায়েরি’ কাব্যগ্রন্থের সফলতা কামনা করি।

আবু কওছর
সম্পাদক ও প্রকাশক
ত্রৈমাসিক সাহিত্য সাময়িকী ‘আলোকিত দাওরাই’।

বিশ্বনাথ উপজেলা : গ্রামের নামকরণ।। মো. খালেদ মিয়া

গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের বাসিন্দা হিসেবে আমাদের গ্রাম আছে, গ্রামের নাম আছে, কিন্তু অধিকাংশ গ্রামের নামকরণের নেপথ্য কারণ-কাহিনি নেই এমনকি থাকলেও আমাদের অজানা। এ ব্যাপারে সম্যক ধারণা থাকা দরকার, কথাটি সত্য হলেও আমরা কজনে কতটুকু জানার আগ্রহ পোষণ করি? আমাদের আগ্রহের অভাব, সচেতনতার অভাব। মানব সভ্যতার সত্যিকার বিকাশের ক্ষেত্রে ওইসব নেতিবাচক প্রবণতা মূলত অন্তরায় স্বরূপ। আমাদের ইতিহাস আছে বাক্যটি যেরূপ সত্য, আমরা ইতিহাস সচেতন নই, বাক্যটিও সেরূপ সত্য মনে করি।

কীনব্রিজটি ধসে পড়ার মুহূর্তে।। কামরান ইবনে দিলওয়ার

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান জনক ‘গণমানুষের কবি’ দিলওয়ার-এর বিগত শতাব্দির ষাটের দশকে লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘কীনব্রিজে সূর্যোদয়’।
সনেটটি আজও বহু কবি ও লেখককে আলোড়িত ও প্রভাবিত করে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই ‘কীনব্রিজ’ নিয়ে পদ্য ও গদ্য লিখেছেন এবং লিখে চলেছেন। আমিও সে দলে অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান গ্রন্থ ‘কীনব্রিজটি ধ্বসে পড়ার মুহূর্তে’ সেই রকম প্রভাব থেকেই রচিত।
প্রকাশক মোহাম্মদ নওয়াব আলীকে গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। গ্রন্থটি কবিতা পাঠকদের কাছে ভালো লাগলে শ্রম সার্থক হবে আশা করছি।

কামরান ইবনে দিলওয়ার

যে মাটি হৃদয় মাঝে।। জ্যোতিষ মজুমদার

ভ্রমণ মানেই ভালোবাসা। বেড়াতে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভ্রমণ মানুষের এক সহজাত নেশা। এই নেশার টানে মানুষ ঘর ছেড়ে ঘুরে বেড়ায় পাহাড় থেকে বনে, বনভূমি থেকে সমুদ্র তীরে, উত্তরমেরু থেকে দক্ষিণমেরু, নায়েগ্রা জলপ্রপাত থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গ পর্যন্ত।
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে বলা হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। কারণ বাংলাদেশে রয়েছে প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য, বিশ্বের দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত, বনভূমি, ষড়ঋতুর বৈচিত্র, সবুজ বনানী ঘেরা পার্বত্যভূমি, ঐতিহাসিক নিদর্শন। এসব নিদর্শনগুলির আকর্ষণে যুগে যুগে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে এসেছিলেন ইতিহাসবিদ ও পর্যটক ইবনে বতুতা, ইবনে খালদুন, হিউয়েন সাং ও ভাস্কো দা গামা। তাদের লেখনীতে আরও বিস্তৃত হয়েছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা। ভ্রমণের উলে−­খযোগ্যতার দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশে বেড়ানোর জায়গা প্রচুর। পর্যটন শিল্পের জন্য বাংলাদেশ একটি আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং বিশ্বের অন্য দেশ ভ্রমণের পূর্বে বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের উচিত নিজেদের দেশের ভ্রমণস্পটগুলো দেখা এবং জানা।

জ্যোতিষ মজুমদার

 

সুর : শেখ মুজিবুর।। দিলওয়ার

দেশ যদি বৃক্ষ হয়, তুমি তার প্রণেতা শিকড়,
তোমাকে দমিয়ে রেখে তাই যারা ঋদ্ধ হতে চায়
বিভ্রান্ত বিশ্বাসে তারা হৃৎপিণ্ডে বিদ্ধ হতে চায়,
বড়ো মর্মান্তিক সেই বিচারক কালের আঁচড়!
-দিলওয়ার

বাংলা সাহিত্যের ‘আধুনিক কবিতার’ অন্যতম প্রধান কবি দিলওয়ার-এর রচনাবলি নতুন করে পাঠ করা দরকার যেমন নতুন প্রজন্মের, তেমনি দরকার রাষ্ট্রের প্রধান শাসক প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ মহোদয়ের।

কেন দরকার? যদি শুধুমাত্র ‘সুর : শেখ মুজিবুর’ এই একটি সনেট-এর সারমর্ম, প্রতিটি ছত্রের ব্যাখ্যা এবং কবিতাটির দিকনির্দেশনা তাঁরা বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারেন; তাহলে তাঁরা যেমন তেমনি দেশবাসীও উপকৃত হবেন এবং অন্যরকম শক্তিও খুঁজে পাবেন চিন্তা-চেতনা ও কর্মে।

‘স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন মোদের বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে কাঁপে পাকিস্তানি শত্র“।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু আমাদের গৌরবময় ইতিহাস নির্মাতা ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশই নন, তিনি বাঙালির ধ্যান-জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা, আদর্শ-দর্শন, রক্ত-মাংস, শিরা-উপশিরাসহ বাঙালির আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘গানে গানে জাতির পিতা’ গ্রন্থের গানগুলোতে বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ, সংগ্রামী জীবন ও সাহসী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্ব ও বিশ্ব রাজনীতিবোধ প্রভৃতি বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মকাণ্ড অত্যন্ত সহজ-সাবলীল ভাষায় চমৎকারভাবে ওঠে এসেছে। একটি গানে বলা হয়েছে ‘চলো চলোরে বাঙালি চলো টুঙ্গিপাড়া যাই, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু রয়েছেন ঘুমাই।’ গানটি মুজিবপ্রিয়দের মন জয়ে সাফল্য লাভে ধন্য হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
‘গানে গানে জাতির পিতা’ বইটি যেকানো রুচিবান পাঠকের সংগ্রহে রাখার মতো।

মোহাম্মদ নওয়াব আলী
প্রকাশক

Developed by: