Homeশীর্ষ সংবাদএকজন অসাধারণ প্রযুক্তি উদ্ভাবক আব্দুল হাই আজাদ বাবলা

একজন অসাধারণ প্রযুক্তি উদ্ভাবক আব্দুল হাই আজাদ বাবলা

002বাসিয়া রিপোর্ট : বর্তমান যুগ তথ্য ও প্রযুক্তির। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। বাংলাদেশে অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তি আছেন, যারা নিজস্ব প্রচেষ্টায় অনেক কিছু উদ্ভাবন করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তেমনি একজন সিলেটের আবদুল হই আজাদ বাবলা। মূল বাড়ি বালাগঞ্জ উপজেলার এওলাতৈল গ্রামে। তবে বর্তমানে বসবাস করছেন সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার ১৭ বি স্বর্নালি ভার্থখলায় এবং গবেষণা কর্ম লাউয়াই থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখাপড়া খুব বেশি নয়। এসএসসি পাশের পর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ভর্তি হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়া হয়নি। জীবিকার সন্ধানে গিয়েছিলেন কুয়েতে। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেননি। মাতৃভূমির টানে চলে আসেন দেশে। ৮০-৮১ সালে বিএডিসির সেচ শাখায় অকেজোঁ ও পরিত্যক্ত অনেক সেচযন্ত্র পাওয়া যেতো। বাবলা এসব সেচ যন্ত্রাংশ কিনে নিয়ে শ্রম ও মেধা খাঁটিয়ে সেগুলো সচল করে তুলতেন। মেরামত ও পুনঃসংযোজন কাজের মাধ্যমেই বাবলা জড়িয়ে পড়লেন বৃহত্তর সিলেটে সেচ কার্যক্রমের সঙ্গে। কৃষি মন্ত্রনালয়ের জাতীয় ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্প ও উত্তর পূর্ব-সেচ প্রকল্পে প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করেছেন।
আবদুল হাই আজাদ বাবলা দেশ ও জাতির কল্যাণে এ পর্যন্ত অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩৫-৪০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ার যে সমস্ত নলকূপ অকেজোঁ হয়ে পড়েছে, সেগুলো স্বল্প খরচে তিনি কার্যকর ও সচল করতে পারেন। আবদুল হাই আজাদ বাবলার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মতে, ৪ ইঞ্চি পাইপের মধ্যে অতিরিক্ত ২ ইঞ্চি পাইপ ঢুকিয়ে নিচে চেক বাল্ব এবং পাইপ সংযোজন আর উপরে ‘টি’ বসিয়ে দুই পাইপের মধ্যবর্তী স্থানে আধা লিটার পানি দিয়ে সফলভাবে প্রতি সেকেন্ড ৮ মিটার পানি উত্তোলন করার যায়। এ প্রযুক্তি উদ্ভাবক করতে বাবলার পরিশ্রম, মেধা ও সময় ব্যয় হলেও আবিষ্কৃত পদ্ধতিটি বেশ সহজ এবং সাশ্রয়ী। আর ফলাফল তো বাজিমাতের মতো। সিলেট অঞ্চলে তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাতীয় ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প এবং উত্তর-পূর্ব ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প আশাতীত ফল লাভ করেছে। এই আবিষ্কারের জন্যে বাবলা সিলেট জেলা কৃষিমেলা ২০০০-এ প্রথম পুরষ্কার লাভ করেছেন। তাঁর উদ্ভাবিত সাতটি প্রযুক্তি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর, ঢাকা আগারগাঁওয়ে দর্শকদের দেখার জন্যে গ্যালারিতে রাখা হয়েছে। অপর্যাপ্ত বালির স্তর থেকে চারমাথা টিউবওয়েলকে এক মাথায় রুপান্তরিত করে পর্যাপ্ত সেচের পানি উত্তোলন পদ্ধতি ও বাবলা উদ্ভাবন করেছেন। এ জন্যে তিনি জেলা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০০-এর ৩য় পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ হচ্ছে ভূগর্ভের বালি ও মাটির স্তর সংরক্ষণ করে রাখার জন্যে পলি প্রিন্টেড ব্যাগ, সারিসোজা ও বীজ রোপণের জন্যে স্বল্প ব্যয়ের লাইনার, নলকূপের পানির স্থিতির মাপ নির্ণয়ের জন্যে ম্যানুয়েল অটো রেকর্ডার, হস্তচালিত নলকূপের পানির লেবেল ৩৫-৪০ ফুটে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে পানি না উঠিয়ে ‘গরিব বন্ধু’ নামের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, নিরাপদভাবে মশার কয়েল জ্বালানোর জন্যে স্বল্প ব্যয়ে বক্স পদ্ধতি, লেবুর রস সংগ্রহের জন্যে স্থানীয় পদ্ধতির যন্ত্র, ভূগর্ভন্থ পানি রিচার্জ করার পদ্ধতি, ক্ষুদ্র ভাসমান পাম্প পদ্ধতি সহ বৃষ্টির পানি সংগ্রহ বা ব্যবহার পদ্ধতি, ৩ বা ৪ টি কূপ সংযুক্ত করে ওপেন ওয়েল সিস্টেম, কমান্ড এরিয়ায় পলি টিউব দ্বারা পানি সেচ দেয়ার পদ্ধতি-১ ও ২ এবং ছারফেইছ ওয়াটার ব্যবহারের লক্ষ্যে নদী থেকে পানি উঠিয়ে সড়ক ও জনপথের পার্শ্ববর্তী খাল দিয়ে সেকেন্ড লিফটিং সেচব্যবস্থা, সল্প ব্যয়ে ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র ইত্যাদি। পদ্ধতিসমূহের উদ্ভাবক আবদুল হাই আজাদের আবিষ্কারস সমূহের জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দান আবশ্যক। একই সাথে তার উদ্ভাবনগুলো পেটেন্ট করাও প্রয়োজন, যাতে কেউ নকল করতে না পারে। সরকারি সাহায্য ও পূষ্ঠপোষকতা পেলে আবদুল হাই আজাদ বাবলা আরো অনেক কিছু উদ্ভাবক করতে সক্ষম হবেন। উদ্ভাবনীয় বিষয় যখন চিন্তা চেতনায় আসে তখন সাথে সাথে তৈরীর জন্য একটি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ প্রয়োজন।
এছাড়া পানিতে আর্সেনিক দূষণ খুব সহজে চিহ্নিত করার উপায় সহ স্বল্প খরচে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি এগুলো বাজারজাত করতে চান এখন।
আবদুল হাই আজাদ বাবলা সাধারণ যন্ত্রাংশ দিয়ে অনেক কঠিন প্রযুক্তিকে সহজভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই দাম পড়েছে কম। স্বল্প আয়ের লোকজন তা ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছেন।
এক সময় তিনি উত্তর-পূর্ব ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের গভীর নলকূপ ও জাতীয় ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে ও ঠিকাদার ছিলেন। তখন থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে সহজভাবে বিভিন্ন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের চিন্তা তার মাথায় ভর করে। বিশেষ করে গ্যাস সমস্যার কারণে সেচ কাজে ব্যবহৃত শ্যালো টিউবওয়েল যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের নেশা তাকে পেয়ে বসে।
১৯৯১ সালে উদ্ভাবন করেন নিউ সিস্টেম শ্যালো টিউবওয়েল ফর গ্যাস প্রবলেম জোন অপশন ওয়ান নামে একটি প্রযুক্তি, যা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে প্রদর্শন গ্যালারিতে সংরক্ষিত আছে। ফলে স্বল্প ব্যয়ে কৃষিকাজে পানি সেচের চাহিদা পূরণ হয়। এ জন্য আবদুল হাই আজাদ বাবলা নতুন কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ে সিলেট জেলা পর্যায়ের কৃষি মেলার শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার লাভ করেন।
গ্যাস ও ভূগর্ভস্থ মাটির চাপে প্লাস্টিক ফিল্টার চেপে যাওয়া এবং ভেঙে যাওয়ার ফলে অকেজোঁ হয়ে পড়া নলকূপের ক্ষেত্রে ও তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির নাম ইনসাইট সাপোর্টার ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২২টি উদ্ভাবন তাকে যথেষ্ট পরিচিতি এনে দিয়েছে। এ জন্য পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। সিলেট বিভাগ থেকে জাতীয় পর্যায়ে ১৯৯৯ সালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পদকের জন্যও মনোনীত হন তিনি। ২০০৫ সালে কৃষি যন্ত্র উদ্ভাবনে জাতীয় কৃষি পদক লাভ করেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এ টু আই প্রকল্পের আওতায় সার্ভিস ইনভেনশন ফান্ডের এওয়ার্ড লাভ করেন। তার বিষয় ছিল ড্রেনের কাদা, বালি, বর্জ্য অপসারণ পাম্প ও বর্জ্য সার উৎপাদন। তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পদক পাওয়ার আশাবাদী। গত ৭ জন সিলেট বিভাগীয় বিজ্ঞান মেলায় উদ্ভাবনী যন্ত্রপাতি প্রদর্শনীতে ও তিনি প্রথম পুরস্কার লাভ করেন।
এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, তিনি নিজের চিন্তা ও চেতনায় যা আসে তাই নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি শুরু থেকেই মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাই বন্ধু-বান্ধবরা তাকে সব সময় উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে নলকূপের পানি আর্সেনিকযুক্ত কিনা তা অতি অল্প ব্যয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব বলেও তিনি দাবি করেন।
আবদুল হাই আজাদ বাবলা ‘লিথলজি অব সিলেট’ নামে এ অঞ্চলের ভূগর্ভের ওপর গবেষণামূলক একটি বইও রচনা করেছেন, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা প্রকাশ করতে পরছেন না। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী খাল দিয়ে সেকেন্ড লিফটিং সেচব্যবস্থা, স্বল্প ব্যয়ে ভুট্টা মাড়াই যন্ত্রসহ অভাবনীয় পদ্ধতিসমূহের উদ্ভাবক আবদুল হাই আজাদ বাবলার আবিষ্কারসমূহের জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দান আবশ্যক। একই সাথে তার উদ্ভাবনগুলো পেটেন্ট করাও প্রয়োজন, যাতে কেউ নকল করতে না পারে। সরকারি সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আবদুল হাই আজাদ বাবলা আরো কিছু উদ্ভাবন করতে সক্ষম হবেন। যাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, যারা আমাকে আর্থিক সহায়তা করেছেন জনাব আলীমুছ এহছান চৌধুরী, আলীম ইন্ডাষ্ট্রিজ, এম.সি বিষ্কুট কোং, যশোর জনাব এনামুল হক। আমি বিভিন্ন স্টাষ্ট্র এর প্রধানদের কাছে আমার গবের্ষণা কর্ম চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা চাচ্ছি। দেশে বিদেশে কর্মরত প্রবাসী আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবদের কাছে আমার গবেষণা কর্ম চালিয়ে যাবার আর্থিক সহায়তা চাচ্ছি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments