Homeবই পত্রদীর্ঘ ৩৭ বছর পর মিললো মায়ের আদর

দীর্ঘ ৩৭ বছর পর মিললো মায়ের আদর

8ea0c96391a12a1b23212a2b51799531ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে দশটা। খুলনা নগরের রূপসা স্ট্যান্ড মোড়ের একটি দ্বিতল ভবন। ভবনটির দোতলার বারান্দায় পায়চারি করছেন প্রায় ৩৭ বছর বয়সী এক নারী। নাম এস্থার জামিনা জর্ডিং। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন। চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ।

দশটা চল্লিশ মিনিট। ছাপা শাড়ি পরা ষাটোর্ধ্ব এক নারী সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে এলেন দোতলায়। অস্থির হয়ে উঠলেন এস্থার। দুজন দুজনের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন। এরপর জড়িয়ে ধরলেন একে অপরকে। ভেঙে পড়লেন কান্নায়।

এঁরা দুজন হলেন মা নূরজাহান বেগম (৬৫) ও মেয়ে এস্থার জামিনা জর্ডিং (৩৭)। নূরজাহান বেগম থাকেন বাগেরহাটের মংলায় আর এস্থার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে। ৩৭ বছর পর মা-মেয়ের দেখা হলো রোববার। ভাষার ব্যবধান হার মানল মাতৃত্বের কাছে।

খুলনার দাকোপ উপজেলার গুনারী গ্রামের নূরজাহান বেগম ও মোহন গাজী দম্পতির পঞ্চম সন্তান জামিলা জন্ম নেন ১৯৭৭ সালের জুন মাসে। তাঁরা থাকতেন চালনায়। অভাবের সংসার। শারীরিকভাবে অসুস্থ মোহন গাজী মেয়েটিকে কাউকে দত্তক হিসেবে দিতে চাইলেন। জামিলার জন্মের পাঁচ দিন পর চালনায় খোয়া ভাঙার কাজ করতে যান নূরজাহান বেগম। ফিরে এসে তিনি আর মেয়েকে পাননি। স্বামী তাঁকে জানান, মেয়েকে বারান্দা থেকে কেউ নিয়ে গেছে। মোহন গাজী স্ত্রীর কাছে মিথ্যা বলেন। আসলে তিনি মেয়েকে খুলনার এজি মিশনে নিয়ে ৫০০ টাকায় বিক্রি করে দেন। এর প্রায় আট মাস পর মেরি ও পেট দম্পতি এজি মিশনে আসেন। তাঁরা জামিলাকে দত্তক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। জামিলা হয়ে যান এস্থার জামিনা জর্ডিং।

এস্থারের তিন ছেলে। স্বামী ল্যান্স জর্ডিং পেশায় কেমিস্ট। ২০১৩ সালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে এস্থারের সঙ্গে পরিচয় হয় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি নওরীন ছায়রার। সেই সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগের আরেক মাধ্যম ফেসবুকে নওরীন ছায়রার ছোট বোন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শিক্ষিকা নাহিদ ব্রাউনের সঙ্গে পরিচয় হয় এস্থারের। এরপর শুরু হয় শিকড়ের সন্ধান। জামিনার সেই সময়ের বাংলাদেশি পাসপোর্টের সূত্র ধরে তাঁরা নিশ্চিত হন তাঁর বাড়ি খুলনার কোনো এক গ্রামে। নাহিদ তাঁর ফুফাতো ভাই খুলনায় কর্মরত আবু শরীফ হুসেন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি (শরীফ) প্রায় এক বছর চেষ্টা করে এস্থারের মা নূরজাহানের সন্ধান পান মংলায়। গত বছরের জানুয়ারি মাসে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এস্থার নিশ্চিত হন, নূরজাহান বেগমই তাঁর মা। গত শনিবার নাহিদ ব্রাউনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুলনায় আসেন এস্থার। রোববার আবু শরীফের বাসায় দেখা হয় মা-মেয়ের।

নূরজাহান বেগম বলেন, ‘সব সময় মনে হতো আমার মেয়ে বেঁচে আছে। ওর আসার খবর শোনার পর ঠিকমতো খেতে পারি না। রাতে ঘুমাতে পারি না। কখন আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা হবে। আজ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি।’

এস্থার জামিনা জর্ডিং বলেন, ‘আমি ভীষণ খুশি। মাকে দেখার অপেক্ষা আর সইছিল না। বারবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’

নাহিদ ব্রাউন বলেন, ‘দুই বছর চেষ্টার পর মা-মেয়ের মিলন ঘটাতে পেরেছি। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর ও শিকড়ের সন্ধান পেয়েছে।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments