স ফ ল ব্য ক্তি ত্ব

আলোকিত শিক্ষক

1464602996বেগম রোকেয়ার সমাজ থেকে এ সমাজের তেমন কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। শুধু খোলস পাল্টেছে মাত্র। সবসময় স্বপ্ন দেখি এমন সমাজের যা হবে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত

বাবা ও মা দু’জনেই ছিলেন কবি। ছোটবেলায় দেখতেন নিজেদের যে কোন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কবি শামসুর রাহমান ও আসাদ চৌধুরীর মত অনেক কবিদের আড্ডা বসতো। এ জন্য ছোট থেকেই সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার জন্ম নেয়। মাত্র ছয় বছর বয়সে ৪১ লাইনের কবিতা মুখস্থ আবৃত্তি করে পুরস্কার লাভ করেন। সে বছরই সেরা হন জাতীয় শিশু সাহিত্য প্রতিযোগিতাতেও। এভাবেই শুরু হয় জেবুন্নেসার সাহিত্যের পথ চলা। এরপর এসএসসি ও এইচএইসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে। ছাত্রজীবনে পুরোদমে লেখা-লেখি চলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকায়। পড়াশুনা শেষ করেই তার কর্মজীবন শুরু হয় ইউএনডিপি’তে জেন্ডার প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে। তারপর গণবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করার পরে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে।

বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা ও লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ আশির দশকের শেষের দিকে তার বাবার রচিত ‘টাকার পাহাড় চাই’ নাটকের একটি সংলাপ ছিল: ‘জন্মদাতা, কর্মদাতা, শিক্ষাদাতার মতোই আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি দেশের মুক্তিদাতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের’। এই সংলাপ শুনেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখবেন। তার প্রথম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ: বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিকোণ ও অভিজ্ঞতা’। এরপর ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয় তার গবেষণাগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী’। সবচেয়ে সাড়াজাগানো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক তার সম্পাদিত গ্রন্থ হলো: ‘আলোকিত নারীদের স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ’।

বইটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আফরোজা পারভীন, পান্না কায়সার, মাহফুজা খানম, লায়লা হাসানসহ মোট ২৭ জন আলোকিত নারীদের লেখা রয়েছে। তাদের যুদ্ধ স্মৃতিতে লড়াই, শোক, দুঃখ আর নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। এদের মধ্যে কারো ভাই, বোন, স্বামীসহ আত্মীয়-স্বজনদের জোর করে ধরে নিয়ে তত্কালীন পাকিস্তানী বাহিনীরা যেভাবে হত্যা করেছে, নির্যাতন করেছে তারই ঘটনা তুলে ধরেন সবাই। সম্প্রতি বইটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন আলোকিত নারী হিসেবে সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধে এমন গবেষণার জন্য জেবুন্নেসা ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন সম্মাননায়। বিনোদনধারা পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড, আমরা কুঁড়ি পদক, বঙ্গবীর ওসমানী স্মৃতি পুরস্কার, নক্ষত্র সাহিত্য পদক, অক্ষর সম্মাননা স্মারক, মৃত্তিকা পদক, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি। এছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নেটওয়ার্ক শিক্ষক, পেশাজীবী নারী সমাজের যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সদস্যসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত রয়েছেন। নিজের এই প্রাপ্তির বিষয়ে তিনি বলেন, একজন নারী হিসেবে আমি আমার অর্জনে সন্তুষ্ট। যা একজন পুরুষের দ্বারাও অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এছাড়া নারীদের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বেগম রোকেয়ার সমাজ থেকে এ সমাজের তেমন কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। শুধু খোলস পাল্টেছে মাত্র। সবসময় স্বপ্ন দেখি এমন সমাজের যা হবে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button