Homeশীর্ষ সংবাদদুরন্ত গতিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি

দুরন্ত গতিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি

de743cae3dfc41633267c56154f12219বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামর্থ্য বাড়ছে। প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে। সচ্ছল বা উচ্চবিত্তের সংখ্যাও বাড়ছে সমানতালে। ফলে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর -(এফএমসিজি) জন্য বাংলাদেশ বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার। এমন তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) গবেষণায়।

ভোগ্যপণ্যের বাজার হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অবস্থানকে তুলে ধরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির ভোক্তাদের ওপর এ জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপটি পরিচালনা করে ‘সেন্টার ফর কাস্টমার ইনসাইট(সিসিআই)’।

দুই হাজারের বেশি দেশীয় ভোক্তার ভোগের ধরনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় কমপক্ষে ৫ হাজার মার্কিন ডলার, তাদেরই এ গবেষণার জন্য বিবেচনা করা হয়েছে। সে হিসেবে এই ভোক্তাশ্রেণির স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ, আরামদায়ক পণ্য ক্রয়ের সামর্থ্য আছে।

বাংলাদেশের বাজার এশিয়ার অন্যান্য দেশের বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গতিশীল, কিন্তু এখন পর্যন্ত তা বেশির ভাগ বহুজাতিক ভোগ্যপণ্য প্রতিষ্ঠানের নজরে আসেনি। যেসব প্রতিষ্ঠান এ বাজারে অবস্থান নিতে আসবে, তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ে করা এ গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ বা ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে আছে। ভিয়েতনামে এমন মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশটির মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৮ শতাংশ ও থাইল্যান্ডে ৫৯ শতাংশ। আশাবাদী হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, জনসংখ্যার অনুপাতে এখনো কম হলেও বাংলাদেশে প্রতিবছর সাড়ে ১০ শতাংশ হারে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে ৩ কোটি ৪০ লাখ হবে। স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

ভোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়ে, গবেষণায় অংশ নেয়া ৮১ শতাংশ মনে করেন তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ৭১ শতাংশ মধ্যবিত্ত বিশ্বাস করেন আগামী এক বছরে তাদের আয় বাড়বে।

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশি ক্রমবর্ধমান ভোক্তাশ্রেণি দামি ব্র্যান্ডের পণ্য ও সেবা নিতে ইচ্ছুক, কিন্তু একই সঙ্গে তারা বাজেট নিয়ে সচেতন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির ৮০ শতাংশই ভোগ্যপণ্য কেনার ক্ষেত্রে ভালো ব্র্যান্ডকে প্রাধান্য দেয়। তাই বাংলাদেশি ভোক্তাদের মন জয় করতে হলে ভোগ্যপণ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের মানের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে গবেষণায়।

গবেষণায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে হয়েছে, এই শ্রেণির ৬৮ শতাংশ ভোক্তার হাতে ইন্টারনেটযুক্ত স্মার্টফোন রয়েছে। নগদ অর্থের চেয়ে মোবাইল ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য পরিশোধে এ শ্রেণির ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। ৮১ শতাংশ মধ্যবিত্ত অনলাইনে পাওয়া তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। পণ্য সম্পর্কে জানতে এই শ্রেণির ৬৬ শতাংশ প্রথমে অনলাইনে খোঁজ করে।

আয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ভোক্তাশ্রেণিকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার, যাদের মাসিক আয় ১৫০ ডলার বা তার কম, তাদের বলা হচ্ছে ‘বটম অব দ্য পিরামিড; ১৫১ থেকে ২৫০ ডলার আয় করা পরিবারকে অ্যাসপিরেন্ট বা আগুয়ান শ্রেণি; ২৫০ থেকে ৪০০ ডলার আয় করা পরিবারকে বিকাশমান মধ্যবিত্ত; ৪০১ থেকে ৬৫০ ডলার আয়কারী পরিবারকে স্থিতিশীল আর ৬৫০ ডলারের বেশি আয় করা পরিবারকে সচ্ছল হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে।

এ গবেষণার জন্য শুধু শেষের দুটি শ্রেণিকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এ দুটি শ্রেণির নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আরামদায়ক ও বিলাসী পণ্য কেনার সামর্থ্য আছে।

আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বরিশালের মতো শহরেও বাড়বে। মধ্যবিত্ত লোকদের এই সংখ্যা বৃদ্ধিকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হবে মূলত ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরকে কেন্দ্র করে। ঢাকা ও চট্টগ্রামকে ঘিরে দেশের পূর্বাঞ্চলে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজার ধরতে এ সময় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২০ থেকে ২০২৫-এই পাঁচ বছরে মধ্যবিত্তদের সংখ্যা অন্যান্য বড় শহর ও অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক লাখ বা এর বেশি মধ্যবিত্ত পরিবার আছে বাংলাদেশের ৩৬টি শহরে, ২০২৫ সালে তা এমন শহরে সংখ্যা দাঁড়াবে ৬১টি। তিন লাখের বেশি মধ্যবিত্ত থাকবে এমন শহরের সংখ্যা বেড়ে ৩৩টি হবে ২০২৫ সালে।

ভোগ্যপণ্য কেনা দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পারিবারিক প্রয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশি জানিয়েছেন, পরিবারের চাহিদা পূরণ না করে নিজের চাহিদা পূরণকে কখনোই প্রাধান্য দেন না তারা। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, একজন মধ্যবিত্ত বাংলাদেশি অ্যাপলের সর্বশেষ সংস্করণের একটি আইফোন কেনার চেয়ে পরিবারের জন্য রেফ্রিজারেটর কেনাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারে এমন মানসিকতার মধ্যবিত্ত আছেন ৩৮ থেকে ৫৭ শতাংশ।

এফএমসিজি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের বাজারে সফল হতে হলে তাদের এ দেশের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এই গবেষণায়। এশিয়ার সম্প্রসারণশীল অন্যান্য বাজারের তুলনায় এ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি গৃহস্থালি পণ্য কেনার ক্ষেত্রে আধুনিক মাধ্যম যেমন সুপার মার্কেট ও চেইন শপের চেয়ে প্রথাগত পদ্ধতিতে কেনাকাটায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পণ্যের ব্র্যান্ড মূল্য নিশ্চিতেও এফএমসিজি কোম্পানিগুলোকে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ওই গবেষণায়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments