Homeবই পত্রমানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড সাঈদীর

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড সাঈদীর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়ে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ বুধবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই রায় ঘোষণা করে।

বেঞ্চের বাকি চার সদস্য বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী এ সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।

এই মামলায় সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষের দুটি আপিল ছিল। আদালত উভয়টির আংশিক মঞ্জুর করে।

রায়ে ১০, ১৬, ১৯ নম্বর অভিযোগে জামায়াতের এই নায়েবে আমিরকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

আর ৮ নম্বর অভিযোগের একাংশের জন্য সাঈদীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৭ নম্বরের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।

৮ নম্বর অভিযোগের অপর অংশসহ ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার দুটি অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের রাজাকার সাঈদীর ফাঁসির রায় দিয়েছিল।

একাত্তরে ভূমিকার কারণে দেইল্যা রাজাকার নামে খ্যাত এই জামায়াত নেতার সাজা কমানোর রায় আসায় তাৎক্ষণিকভাবে আদালতের বাইরে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ও শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা  বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

শাহবাগে শ্লোগান ওঠে – ‘আঁতাতের এই রায় মানি না, প্রহসনের এই রায় মানি না’।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা ছিল মৃত্যুদণ্ড। ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছিল তা বহাল থাকবে এটাই ছিল প্রত্যাশা। সেটা থাকেনি। আমার খুব খারাপ লাগছে।”

তবে আপিল বিভাগের রায়ের পর ‘ধর্মীয় নেতা’ হিসাবে সাঈদীর মুখোশ খুলে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, “আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাইনি। হাতে পেলে বুঝতে পারব কোন কোন জায়গায় আরো তথ্য প্রমাণ প্রয়োজন ছিল।”

তিনি বলেন, “সর্বোচ্চ শাস্তি আমাদের প্রত্যাশিত ছিল। তবে আমরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।”

সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, “আমরা এ রায়ের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। খালাস আশা করেছিলাম।”

এই জামায়াত নেতার ছেলে মাসুদ সাঈদী রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “ফাঁসি কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে। তারপরও আমরা বলব যে ন্যায়বিচার পাইনি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল নির্দোষ প্রমাণ হয়ে বেকসুর খালাস পাব। আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর রিভিউ আবেদন করব।”

এই রায়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিতীয় আসামির মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো।

এর আগে তার দলেরই নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার আপিল নিষ্পত্তির পর গত বছরের ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীর বিচার শুরু হয় ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর।

হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো অপরাধে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

ওই রায়ের পর সারা দেশে সহিংস বিক্ষোভে নামে জামায়াতকর্মীরা। তাদের তাণ্ডবে প্রথম তিন দিনেই নিহত হন পুলিশসহ অন্তত ৭০জন। অর্ধশতাধিক। পুড়িয়ে দেওয়া গাড়ি, বাড়ি এমনকি বিদ্যুৎ কেন্দ্রও।

রায়ের বিরুদ্ধে সাঈদী আপিল করলে শুনানি শেষে গত ১৬ এপ্রিল তা রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখে আপিল বিভাগ। তার পাঁচ মাস পর এই রায় এলো।

মঙ্গলবার রায়ের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজধানীসহ সারা দেশে আদালত, সরকারি দপ্তর, পেট্রোল পাম্পসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় মঙ্গলবার থেকেই নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়।

রায় ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট এলাকাতেও নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। আর্চওয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আইনজীবী-সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের আদালতে ঢুকতে দেয়া হয়।

৭৪ বছর বয়সী সাঈদী বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে রয়েছেন। ২০১০ সালের ২৯ জুন থেকে কারাবন্দি তিনি।

তবে এর মধ্যে মা ও ছেলের মৃত্যুর পর দুই দফায় কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন পিরোজপুর থেকে দুই বার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর একে একে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় তাদের, চলতে থাকে বিচার।

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম রায়ে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি জামায়াতের সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে। পলাতক থাকায় তিনি এর বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেননি।

এর পরের মাসের ৫ তারিখে দ্বিতীয় রায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। আপিল শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১২ ডিসেম্বর ওই দণ্ড কার্যকর হয়।

ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায়ে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের আজীবন কারাদণ্ড হয়। মৃত্যুদণ্ড হয় দলটির নেতা আলী আহসান মো. মুজাহিদ, মো. কামারুজ্জামানের।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments