Homeখেলাধুলাসেই বৃষ্টিই এখন ‘অভিশাপ’

সেই বৃষ্টিই এখন ‘অভিশাপ’

প্রেসবক্সের বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছিল দৃশ্যটা। বৃষ্টির মধ্যেই কাদাপানিতে ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছে তিন কিশোর। মনে তাদের খেলার আনন্দ। শরীরী ভঙ্গে উচ্ছলতা। মলিন মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠ তাতেই কতটা প্রাণবন্ত!
প্রেসবক্সের আরেক পাশের মাঠ জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম। ঢিল ছোড়া দূরত্বে হলেও কৌলীন্যে মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠের চেয়ে প্রায় আলোকবর্ষ দূরত্ব এগিয়ে। তবু এ মাঠই কাল কতটা নিষ্প্রাণ! মাঝমাঠে জলপাই রঙের আচ্ছাদনের নিচে নিথর পড়ে থাকল উইকেটের ‘শব’। তাতে প্রাণ দিতে নেই ব্যাট-বলের দ্বৈরথ।
বৃষ্টি কাল কেড়ে নিল চতুর্থ দিনের পুরোটাই। তাতে এক দিন বাকি থাকতে চট্টগ্রাম টেস্ট দেখে ফেলেছে ফলাফলের দিগন্ত। ক্রিকেটের স্বাভাবিক অনিশ্চয়তা কয়েক লাখ গুণ বেড়ে না গেলে এই ম্যাচের ললাটে ড্র-ই লেখা আছে।
কিন্তু এই ড্র কতটা মেনে নিতে পারবে বাংলাদেশ দল? ওয়ানডের ধারাবাহিক সাফল্য যখন টেস্টেও প্রস্ফুটিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, তখনই বৃষ্টির ঝাপটায় সব সম্ভাবনা ভেসে যাওয়ার পথে। তৃতীয় দিন শেষের ম্যাচ পরিস্থিতি বাংলাদেশ দলের মানসে এঁকে দিচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলার সুযোগ আর কই! শেষ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার ১০ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচও জিতে যাবে, এটা কল্পলোকের ক্রিকেটেও সম্ভব কি না, কে জানে।
চট্টগ্রামে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা দুই দলেরই আবাস আভিজাত্যে মোড়া ২০ তলা র্যাডিসন ব্লু হোটেলে। বন্দরনগরের নতুন আকর্ষণ এটি, যার ওপর থেকে এক ঝলকে দেখে নেওয়া যায় পুরো চট্টলাই। হোটেলের প্রতিটি তলায়, প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আয়েশ-আনন্দের কত না উপকরণ! এমন জায়গায় বৃষ্টির দিনেও নিজেকে বন্দী মনে হওয়ার উপায় নেই।
বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অবশ্য পুরোই উল্টো। তাদের দেখে মনে হচ্ছে র্যাডিসন ছুটি কাটাতে আসাদেরই কেবল বৃষ্টি-বিলাসের আনন্দ দিতে পারে, ক্রিকেট খেলতে আসাদের নয়। কাল প্রায় সারা দিনই হোটেলে কাটালেও খেলোয়াড়দের মন পড়ে ছিল মাঠে। নাসির হোসেন, রুবেল হোসেন, সৌম্য সরকার আর লিটন দাস ছাড়া বাকিরা অবশ্য টিম ম্যানেজমেন্ট সদস্যদের সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য স্টেডিয়াম ঘুরে গেলেন। দু-একজন ইনডোরে টুকটাক ব্যাটিং প্র্যাকটিস করেছেন। বাকিরা পাশের মসজিতে জুমার নামাজ পড়ে ফিরে গেছেন হোটেলে।
কিন্তু হোটেল মানে তো সেই বন্দীশালা! মুঠোফোনে এক ক্রিকেটারের কথাই মনে করিয়ে দিল শব্দটা, ‘যত ভালো হোটেলই হোক, খেলতে এসে কি হোটেলে শুয়ে-বসে থাকতে ভালো লাগে? খেলা হলেই বরং আমাদের জন্য লাভ হতো।’ দেশের অন্যতম বিলাসবহুল হোটেলে থেকেও এমন রোমাঞ্চহীন অনুভূতির কারণ ওই একটাই—শ্রাবণের বারিধারায় যে ভেসে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের হাতছানি! টেস্ট ক্রিকেটে বৃষ্টি এর আগে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়েই আসত। ম্যাচের এক-দুই দিন বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া মানে ছিল টেস্ট ড্র করার সুযোগ উঁকি দেওয়া। অথচ কালকের বৃষ্টিটাকে মনে হচ্ছে ‘অভিশাপ’, জিততে দিচ্ছে না বাংলাদেশকে!
আশা, আফসোস জাতীয় অনুভূতিগুলোর সঙ্গে আবেগের যোগসূত্র থাকে। চট্টগ্রামে শেষ দুই দিন পুরো খেলা হলে বাংলাদেশ জিতত, এমন প্রত্যাশায়ও তা মেশানো। বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া দিন নিয়ে সাধারণের মতের সঙ্গে হয়তো সে জন্যই মিলছে না দল-সংশ্লিষ্টদের অনুভূতি। ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ যেমন শেষ দুই দিনে সম্ভাবনা দেখছিলেন ফিফটি-ফিফটি, ‘এমন নয় যে বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ায় খেলোয়াড়েরা খুব হতাশ। আবার এটাও ঠিক, খেলা হলে আমাদের একটা সম্ভাবনা ছিল। তবে সে সম্ভাবনা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা দলেরও।’ ক্রিকেটারদেরও একই মত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যাটসম্যান বললেন, ‘সুযোগ যে শুধু আমাদেরই ছিল, তা নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানেরাও নিশ্চয়ই চাইত বড় রান করতে। সে ক্ষেত্রে আমাদের চাপে পড়ারও সম্ভাবনা ছিল।’ তবে আফসোস একটু হলেও আছে এবং তা বোঝা গেল পরের কথায়ই, ‘এই টেস্টে আমরা ভালো খেলছিলাম। সবার মধ্যে বাড়তি আত্মবিশ্বাস আছে এখন। সেদিক দিয়ে মনে হয় আমাদেরই সুযোগ বেশি ছিল। এ রকম সুযোগ সব সময় আসে না।’
আগের দুই দিনে বৃষ্টির ঝাপটায় ভেসে গেছে টেস্টের প্রায় ৫০ ওভার। আর কাল সারা দিনে পিচ কাভারই উঠল না। শেষ দিনে কিছু যদি খেলা হয়ও, তা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকানদের ব্যাটিং প্র্যাকটিসেরই উপলক্ষ হবে। আর না হলে র্যাডিসনের লবি কাল সন্ধ্যার মতো আজও হয়ে উঠতে পারে ভক্ত-সমর্থকদের মেলা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments