বিচারপতিদের অপসারণ বা অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে সংবিধানের ষষ্ঠদশ সংশোধন আইন-২০১৪ মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ এর স্থলে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপিত হবে। জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে এ সংক্রান্ত বিলটি উপস্থাপিত হবে এবং বিলটি পাস হলে আগামী তিন মাসের মধ্যে আইনে পরিণত করা হবে।বর্তমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে ’৭২ এর সংবিধানের যে অংশ প্রতিস্থাপিত হবে তা হলো “(১) এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলী সাপেক্ষে কোন বিচারক সাতষট্টি বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন। (২) প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না। (৩) এই অনুচ্ছেদের ২-দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত বা প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন। (৪) কোন বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগ করিতে পারিবেন।” উল্লেখ্য, ৭২ এর সংবিধানে বিচারকের বয়স ৬২ ছিল কিন্তু সংবিধানের ষষ্টদশ সংশোধনীতে বয়স বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সাতষট্টিই রাখা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) আইন-২০১৪ এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা খসড়াটি ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সংসদের আগামী অধিবেশনেই সংশোধন প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের অনুমোদনের ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের যে বিধান ছিল, সংবিধান সংশোধন করে সেটিই আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের নিয়মটি বাদ পড়ছে। তিনি বলেন, সামরিক ফরমান বলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। সংশোধন করে এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে অর্পণ করা হয়। ১৯৭৮ সালে জাতীয় সংসদের অনুপস্থিতিতে এটি করা হয়েছিল। সচিব বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ বর্তমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের স্থলে প্রতিস্থাপিত করা হবে। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবটিতে বলা হয়, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের যে বিধান বর্তমান সংবিধানে রয়েছে তা সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। একজন অভিযুক্ত বিচারক ও কাউন্সিলের সদস্য একই প্রতিষ্ঠানে অনেক দিন কাজ করার কারণে তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তার যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাছাড়া সংসদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও স্পিকারকে অপসারণ করার বিধান রয়েছে; ৫৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণেরও বিধান রয়েছে।মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকার বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি আইন কমিশনও বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত বাহাত্তরের মূল বিধানটি পুনর্বহালের পক্ষে মত দিয়েছে। ’৭২-এর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের এ বিধানটি আর থাকবে না। মোশাররাফ হোসাইন বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ায় খসড়াটি এখন বিল আকারে সংসদে তোলা হবে। সংসদের অনুমোদনের পর আরেকটি আইন করা হবে, তাতে বিচারকদের অসামর্থ্য, অসদাচরণ ও অভিযোগ সম্পর্কে কীভাবে তদন্ত হবে, সংসদ কীভাবে প্রস্তাব নেবে এবং রাষ্ট্রপতি কোন প্রক্রিয়ায় তা অনুমোদন করবেন- এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলা থাকবে। এটি আলাদা কোনো বিষয় নয়, এ আইনেই তা বলা হয়েছে এবং তা আলোচনা করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, অনুমোদন দেওয়ার আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্যান্য দেশের নজির নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য অনুমোদন দিলে রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ দিতে পারেন। যুক্তরাজ্যের নিয়ম হলো- পার্লামেন্টের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাব পাস হতে হবে, তারপর রানী তাতে অনুমোদন দেবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানেও অভিশংসনের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া আছে। প্রতিনিধি সভা ও সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের সম্মতি পেলে বিচারকদের অপসারণ করা যায়। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সংবিধানে একই বিধান রয়েছে।এদিকে মন্ত্রিসভা বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল এ বিষয়টির ওপর বেশ কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী আলোচনা করেন। এর মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক।উল্লেখ্য, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর। সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগে বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট ৯৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘‘(২) এই অনুচ্ছেদের নিুরূপ বিধানাবলী অনুযায়ী ব্যতীত কোন বিচারককে তাঁহার পদ হইতে অপসারিত করা যাইবে না। (৩) একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকিবে যাহা এই অনুচ্ছেদে ‘কাউন্সিল’ বলিয়া উল্লেখিত হইবে এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাঁহাদের লইয়া গঠিত হইবে : তবে শর্ত থাকে যে, কাউন্সিল যদি কোন সময়ে কাউন্সিলের সদস্য এইরূপ কোন বিচারকের সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করেন, অথবা কাউন্সিলের কোন সদস্য যদি অনুপস্থিত থাকেন অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন কারণে কার্য করিতে অসমর্থ হন তাহা হইলে কাউন্সিলের যাহারা সদস্য আছেন তাঁহাদের পরবর্তী যে বিচারক কর্মে প্রবীণ তিনিই অনুরূপ সদস্য হিসাবে কার্য করিবেন। (৪) কাউন্সিলের দায়িত্ব হইবে- (ক) বিচারকগণের জন্য পালনীয় আচরণবিধি নির্ধারণ করা; এবং (খ) কোন বিচারকের অথবা কোন বিচারক যেরূপ পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন সেইরূপ পদ্ধতি ব্যতীত তাঁহার পদ হইতে অপসারণযোগ্য নহেন এইরূপ অন্য কোন পদে আসিন ব্যক্তির সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করা। (৫) যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোন সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতির এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে কোন বিচারক- (ক) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে তাঁহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে অযোগ্য হইয়া পড়িতে পারেন, অথবা (খ) গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। (৬) কাউন্সিল তদন্ত করিবার পর রাষ্ট্রপতির নিকট যদি এইরূপ রিপোর্ট করেন যে, উহার মতে উক্ত বিচারক তাঁহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন অথবা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইয়াছেন তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা উক্ত বিচারককে তাঁহার পদ হইতে অপসারিত করিবেন। (৭) এই অনুচ্ছেদের অধীনে তদন্তের উদ্দেশ্যে কাউন্সিল স্বীয় কার্য-পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করিবেন এবং পরওয়ানা জারি ও নির্বাহের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের ন্যায় উহার একই ক্ষমতা থাকিবে।’

