বিভাগ: ইতিহাস ঐতিহ্য

শুরু হয়েছে হজের আনুষ্ঠানিকতা

 বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীতে দ্বিতীয় হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। মাত্র ৬০ হাজার হজযাত্রীর পদচারণায় মিনার মাঠে শনিবার শুরু হয়েছে এ বছরের পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘ ৯০ বছরের ইতিহাসে পর পর দ্বিতীয়বার সৌদি আরবের বাইরের কোন দেশ থেকে হজে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না কেউ। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গতবছরও একই কায়দায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত আকারে মাত্র দশ হাজার মুসলিম নিয়ে হজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যায় মক্কা থেকে মীনায় রওনা হন এবারের হজে অনুমতি পাওয়া মুসল্লিরা। ৫ লাখ ৫৮ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ৬০ হাজার মুসল্লি এবার হজে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। হজের অনুমতি পাওয়া সবাই কোভিড-১৯ টিকার দু’টি ডোজই নিয়েছেন। বড় ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতা নেই-এমন মুসল্লিরা- সুযোগ পেয়েছেন তাদের সবার বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত।

পবিত্র কোরান ও হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম হজ। মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভই হজ পালনের প্রধান উদ্দেশ্য। হজের প্রতিটি কাজের মধ্যেই আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ, তার মুখাপেক্ষী হওয়া তার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তার নির্দেশিত পথে বাকি জীবন পরিচালনার স্বীকৃতি ও অনুশীলনই প্রকাশ পায়। হজ মাবরুর বা কবুল হওয়া হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। এ জন্য হাজীরা সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করেন আল্লাহ যেন হজ পালনকে সহজ করে দেন এবং তার হজকে মাবরুর হজ হিসেবে কবুল করেন। পবিত্র মক্কায় হাজীদের বায়তুল্লাহ জিয়ারত, আরাফাতের ময়দানে অবস্থানসহ আনুষঙ্গিক আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে হজ পালিত হয়। বিত্তবান ও শারীরিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ এবং প্রতিবছর কোরবানি দেয়া ওয়াজিব।

সৌদি আরবে হিজরি মাস গণনা অনুযায়ী আজ ৮ জিলহজ। মক্কার অদূরে মিনার তাঁবুতে হাজীদের অবস্থানের দিন। আগামীকাল ৯ জিলহজ সোমবার মিনা থেকে গিয়ে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন অর্থাৎ হজের দিন। মিনা থেকে হাজীরা আরাফাতের ময়দানে গিয়ে অবস্থান নেবেন। এটাকে বলা হয় অকুফায়ে আরাফা। ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক ৯ জিলহজ ভোর থেকে সন্ধ্যা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করার নামই হজ। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ফরজ। এখানে কেউ অবস্থান না করলে তার হজ আদায় হবে না।

যদিও অন্যান্য বছর অধিক সংখ্যক হজযাত্রীর কারণে ভিড় এড়াতে আগের দিন সন্ধ্যার পর থেকেই হজযাত্রীদের মিনার তাঁবুতে অবস্থান শুরু হয়ে যেত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে এ বছর মাত্র ৬০ হাজার হজযাত্রীর অংশগ্রহণে হজ পালিত হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের ১৬০টির বেশি দেশের ২০ লাখ মুসলিম হজ পালন করেছেন। গত বছর থেকে সে চিত্র পাল্টে গেছে। এবার বিভিন্ন স্থানে হাজীদের সেবা দিতে ৪৫টি স্ট্রোক সেন্টার থাকবে। জাবালে রহমত এলাকায় ২৩টি ও মিনা প্রান্তরে থাকবে ২২টি। এছাড়াও ৪২টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থাকবে। হজের স্থানগুলোতে চিকিৎসাসেবা দিতে কাজ করবে ৩২টি চিকিৎসক দল ও ৩৬টি এ্যাম্বুলেন্স।

এবারও স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনেই হজ সম্পন্ন করতে হবে। মীনার মাঠে প্রতিটি খিমায় বা তাঁবুতে আগে যেখানে ৮/১০ জন অবস্থান করতেন, এবার সেখানে ৩ থেকে বড়জোর ৫ জন অবস্থান করার সুযোগ পাবেন। গতবারও একই কায়দায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই হজ সম্পন্ন করেছেন মুসল্লিরা। প্রতিটি খিমার সামনে রাখা হয়েছে হ্যান্ডস স্প্রে, স্যানিটাইজার, পর্যাপ্ত সাবান ও টিস্যুর সুব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন হজযাত্রীর যদি শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তাহলে তাৎক্ষণিক নিকটবর্তী ফাস্ট এইডে অক্সিজেন নেয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়া সার্বক্ষণিক এ্যাম্বুলেন্সেরও সুব্যবস্থা রাখা আছে।

আজকের দিনটিকে মীনা দিবসও বলা হয়। মূলতঃ ৮ জিলহজ ফজরের নামাজের পর থেকেই ইহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ করতে করতে হাজীদের মিনার তাঁবুতে গিয়ে অবস্থান করার নিয়ম। সে হিসাবে হজের দিনগুলোর সূচনা গতকাল থেকেই শুরু। আজ নির্ধারিত স্থান (মিকাত) থেকে ইহরাম বেঁধে মিনায় অবস্থান করেই হাজীরা হজের সব করণীয় সম্পন্ন করবেন। সেখান থেকেই কাল আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন। দিন শেষে আরাফাতের ময়দান থেকে ফেরার পথে মুজদালিফায় রাত যাপন করে ১০ জিলহজ (মঙ্গলবার) সকালে আবার মিনার তাঁবুতে ফিরবেন। সেখান থেকে গিয়েই জামারাহ তথা শয়তানের প্রতিকৃতিতে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করবেন। কোরবানি করবেন এবং তাওয়াফে জিয়ারাহ, সাফা মারওয়া সাঈ করে আবার মিনার তাঁবুতে ফিরে আসবেন। পরের দুই দিনও একইভাবে মিনার তাঁবু থেকে গিয়ে জামারায় পাথর নিক্ষেপ করবেন। ১২ অথবা ১৩ জিলহজ পাথর নিক্ষেপ শেষ করে হাজীরা মিনার তাঁবু ত্যাগ করে হজের কর্তব্যের সমাপ্তি ঘটাবেন। এরপর মক্কা ত্যাগ করার আগে বিদায়ী তওয়াফ করে যে যার অবস্থানে চলে যাবেন। মিনার তাঁবুতে হাজীরা তালবিয়া পাঠ ছাড়াও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকেন। হজের মাসলা মাসায়েল নিয়ে নিজেরা আলোচনা করেন। আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে মোনাজাত করেন।

এদিকে শনিবার ফোন করে জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যা থেকেই এক যোগে সব হাজিরা রওনা হন মীনার উদ্দেশে। এ সময় পবিত্র মিনা লাখ লাখ মুসল্লির ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ তালবিয়া পড়তে থাকেন। মূলত ৭ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় অবস্থান করেই হজ সম্পন্ন করতে হয়। হাজিরা মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত কসর নামাজ আদায় করবেন। আগামীকাল ফজরের পর তারা আরাফাতের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। শরীয়ত মোতাবেক হজের অংশ হিসেবে সোমবার সকাল পর্যন্ত তারা অবস্থান করবেন মিনায়। সেখানে হাজিরা সারা জীবনের পুঞ্জীভূত গোনাহ মাফ ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় জিকির-আজকার ও ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে সময় কাটাবেন। প্রতিদিন নিজ নিজ খিমায় (তাঁবু) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবেন জামাতের সঙ্গে। আগামীকাল হজযাত্রীরা নিজ নিজ খিমায় ফজরের নামাজ আদায় শেষে- আরাফাতের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সাধারণত হজ যাত্রীরা নিজস্ব মোয়াল্লেমের ব্যবস্থাপনায় পাঠানো বাসে মীনার মাঠ থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের আরাফাতের ময়দানে পৌঁছে থাকেন। ফজর থেকে শুরু তাদের যাত্রা শুরু হয়। চলে দুপুর পর্যন্ত। হজ যাত্রীরা খোদার প্রেমে উম্মাদের মতো ছুটেন আরাফাতে। তাদের সঙ্গে থাকে শুধু একটি ব্যাগ- যাতে রাখা হয় একটি কিছু অতীব জরুরী জিনিসপত্র। যেমন থালা বাসন, পানির মগ, ওষুধ ও অজু-গোসলের জন্য গামছা জাতীয় কাপড় চোপড়।

ঈদুল আদ্বহা আত্মত্যাগের এক বিরল উপমা || মুফতি সাদিকুর রহমান খাদিমানী

মহীয়ান গরীয়ান সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা। যিনি বাছাই করে করে পূর্ববর্তী নবী ও প্রিয় বান্দাদের মকবুল ইবাদতগুলো উম্মতে মুহাম্মদীকে দান করেছেন। শত কোটি দরূদ ও সালাম তাঁর পেয়ারা হাবীব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) প্রতি। যাকে সৃষ্টি না করলে কোন কিছুই সৃষ্টি হত না।
কুরবানির ইতিকথা : আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবীল ও হাবীলের দেওয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপর এটা জারী ছিল। আমাদের উপর যে কুরবানীর নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলত ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক শিশু পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে চালু হয়েছে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.) আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যে নজিরবিহীন ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যুগ পরম্পরায় তারই স্মৃতিচারণ হচ্ছে ‘ঈদুল আদ্বহা’ বা কুরবানীর ঈদ। পবিত্র কুরআনে কুরবানীর বদলে ‘কুরবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদীসেও ‘কুরবানী’ শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে এর পরিবর্তে ‘উদ্বহিয়্যা’ ও ‘আদ্বাহ্যি’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর এজন্যই কুরবানীর ঈদকে ‘ঈদুল আদ্বহা’ বলা হয়। আরবী ‘কুরবান’ শব্দটি ফারসী বা উর্দূতে ‘কুরবানী’ রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’। আর পারিভাষিক অর্থে ‘কুরবানী’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয়। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আদ্বহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারয়ী তরীকায় যে পশু যবেহ করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়। কুরবানী নিছক কোন প্রথা নয় বরং এটি মুসলমানদের একটি ইবাদাত। যিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে এই ইবাদত পালন করতে হয়।
কুরবানীর গুরুত্ব : ঈদুল আযহার গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন-হাদীসে এ ব্যাপারে যথেষ্ট তাকীদ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-‘কুরবানীর পশুসমূহকে আমি তোমাদের জন্য আমার নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ’। (সূরা হজ্জ-৩৬)
আল্লাহ তা’য়ালা আরও বলেন, ‘আর আমি তাঁর (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবেহ করার জন্য দিলাম একটি মহান কুরবানী। আমি এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’। (সূরা ছাফফাত-১০৭, ১০৮)। আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর।’ (সূরা কাওছার-২)
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (ইবনে মাজা-৩১২৩)
আম্মাজান আয়শা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কুরবানীর দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহ্ তা’আলার নিকট সব চাইতে পছন্দনীয় হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানী করা)। কিয়ামতের দিন তা নিজের শিং, পশম ও ক্ষুরসহ হাজির হবে। তার (কুরবানীর পশুর) রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে এক বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা আনন্দিত মনে কুরবানী কর।’ (ইবনু মাজাহ-৩১২৬)
এক বর্ণনায় আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কুরবানীকারীর জন্য প্রতিটি লোমের বিনিময়ে সাওয়াব আছে। অপর এক বর্ণনায় আছে প্রতিটি শিং-এর বিনিময়ে।’ (তিরমিজি-১৪৯৩)
এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’ যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীম’ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে মদিনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং সাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কুরবানী করেছেন। অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহ্ সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে। এটি কিতাব ও সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা সুপ্রমাণিত।
ঈদুল আদ্বহায় করনীয় : ঈদের রাত সম্পর্কে হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহার রাতে জাগরিত থেকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে, তার বদলে যেদিন অন্যান্য দিল মরে যাবে সেদিন তার দিল মরবে না অর্থ্যাৎ, কিয়ামতের দিনের আতঙ্কের কারণে অন্যান্য লোকের অন্তর ঘাবড়ে গিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে যাবে, কিন্তু দুই ঈদের রাত্রে জাগরণকারীর অন্তর তখন ঠিক থাকবে ঘাবড়াবে না। (তাবারানী)
ঈদের দিনগুলো অর্থাৎ দুই ঈদ ও ঈদুল আদ্বহার পরের তিন দিন সহ মোট পাঁচ দিন রোজা রাখা হারাম। এই পাঁচ দিন পানাহারের মধ্যে কিছু বেশি জাঁকজমক করার সাধ্যানুযায়ী অবকাশ আছে এবং তা শরীয়তের কাম্য।
ঈদ-উল-আদ্বহার সুন্নাহসমূহ : *সকাল সকাল ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। *মেসওয়াক করা। *গোসল করা। *যথাসাধ্য উত্তম পোষাক পরিধান করা। *শরী’আত সম্মতভাবে সাজ-সজ্জা করা। *সুগন্ধি বা খুশবু লাগানো। *ঈদগাহে যাবার আগে কিছু না খাওয়া। *আগে আগে ঈদগাহে যাওয়া। *ঈদগাহেই ঈদের সালাত আদায় করা। *পায়ে হেটে ঈদগাহে যাওয়া। *যাবার সময় তাকবীর জোরে জোরে বলতে বলতে যাওয়া। তাকবীরটি হচ্ছে এই-‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লালাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’ *এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে প্রত্যাবর্তন করা। *ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আদ্বহার সালাত সকাল সকাল আদায় করা।
কুরবানীর পশু জবাহ করা প্রসঙ্গে : *নিজ পশু নিজেই জবেহ করা উত্তম। না পারলে জবেহের সময় সামনে থাকা। *পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে জবেহ করা, জবাইকারীও কিবলাহমুখী হওয়া। *ধারালো ছুরি দ্বারা জবাই করা। *জবাই করার পর পশুটি সম্পুর্ণ নিস্তেজ হওয়ার পর বাকী কাজ শুরু করা, আগে না। *জবাই করার পূর্বে বেশি পরিমাণে পানি খাওয়ানো উচিত, প্রাণীকে ক্ষুধার্থ রাখা জুলুম। *ঈদের নামাজের পরে কোরবানী করা। *গোশত দিয়ে কোন পারিশ্রমিক দেয়া যায়েজ নেই। *গোশত তিন ভাগ করে- নিজে, আত্মীয়-স্বজন এবং গরিব-মিসকীনদের দেয়া উত্তম।
কুরবানী সংক্রান্ত কিছু মাসায়েল :
১. কার উপর কুরবানী ওয়াজিব : প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
২. নেসাবের মেয়াদ : কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
৩. কুরবানীর সময় : মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮
৪. নাবালেগের কুরবানী : নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬
৫. দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম : দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২
৬. প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে : যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করা জায়েজ নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামাজ না হয় তাহলে ঈদের নামাজের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েজ।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
৭. রাতে কুরবানী করা : ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েজ। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো।-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০
৮. কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই করলে : কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১
৯. কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে : উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েজ নয়।-কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
১০. নর ও মাদা পশুর কুরবানী : যেসব পশু কুরবানী করা জায়েজ সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়।-কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
১১. কুরবানীর পশুর বয়সসীমা : উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েজ। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েজ হবে না।-কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে? ৪/২০৫-২০৬
১২. এক পশুতে শরীকের সংখ্যা : একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারওটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারও কুরবানী সহীহ হবে না।-সহীহ মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯
১৩. সাত শরীকের কুরবানী : সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
১৪. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েজ। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ ১৫. কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ : কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২
১৬. কুরবানীর উত্তম পশু : কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম।-মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০
১৭. নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা : কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ
১৮. জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে : অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪
১৯. কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে : কয়েকজন মিলে কুরবানী করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয় তবে তা জাজেয় হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬
২০. কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা : কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েজ।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪
২১. কুরবানীর গোশত বণ্টন : শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নয়।-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১
২২. কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।-বাদায়েউস সানায়ে? ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০
২৩. জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া : জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্ব চুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসেবে গোশত বা তরকারি দেওয়া যাবে।
২৪. জবাইয়ের অস্ত্র : ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
২৫. পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা : জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩
২৬. কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া : কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েজ।-ইলাউস সুনান ৭/২৮৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০
২৭. কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে : কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। গরিব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯
২৮. নবী কারীম (সা.)পক্ষ থেকে কুরবানী করা : সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ (সা.) পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম (সা.) আলী (রা.)-কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)এর পক্ষ থেকেও কুরবানী দিতেন।-সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে তিরমিযী ১/২৭৫
২৯. কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা : কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি।-আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১
৩০. কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা : ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়।-জামে তিরমিযী ১/১২০, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬, আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৩
৩১. জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া : কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েজ। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না।-কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫
৩২. মোরগ কুরবানী করা : কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না জায়েজ। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না।-খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০
মহান আল্লাহর বাণী দিয়ে শেষ করছি সূরা আল হাজ্জ ৩৭ নং আয়াত ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না ওগুলির গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া। এভাবে তিনি ওগুলিকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এ জন্য যে, তিনি তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং তুমি সুসংবাদ দাও সৎকর্মশীলদেরকে।’ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালবাসায় নিবেদিত হোক আমাদের কুরবানী।

লেখক : আরবি প্রভাষক, কামাল বাজার ফাজিল মাদরাসা, বিশ্বনাথ, সিলেট।

বিশ্বনাথ আমার অহংকার :: আফিয়া বেগম শিরি ::

সিলেট শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে বিশ্বনাথ উপজেলার অবস্হান। ৮টি ইউনিয়নের সমন্নয়ে গঠিত এ জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য ব্যাপক পরিচিতি আছে। ইউনিয়ন সমূহের নাম হচ্ছে – রামপাশা ইউনিয়ন, লামাকাজী ইউনিয়ন, খাজাঞ্চী ইউনিয়ন, অলংকারী ইউনিয়ন, দেওকলস ইউনিয়ন, দৌলতপুর ইউনিয়ন, দশঘর ইউনিয়ন, বিশ্বনাথ ইউনিয়ন।

জমিদার বিশ্বনাথ চৌধুরীর ভূমির উপর প্রথমে বাজার স্হাপিত হওয়ায় বাজারের নামকরন করা হয় বিশ্বনাথ বাজার। সেই বাজারে একটি পুলিশ ফাঁড়ি হয় এবং সেই পুলিশ ফাঁড়ি সিলেটের অন্যান্য পুলিশ ফাঁড়ির মতো বিশ্বনাথ পুলিশ ফাঁড়ি থানায় রুপান্তিত হয়, তাই বিশ্বনাথ চৌধুরীর নামানুসারে থানারও নামকরন হয় বিশ্বনাথ থানা। বিশ্বনাথ বাজার এখন একটি সমৃদ্ধশীল বাজারে পরিনত হয়েছে। সড়কপথের ব্যাপক সুযোগ সুবিধা থাকায় বিশ্বনাথ যাতায়াতের ব্যবস্হা অনেকটা সহজতর হয়েছে।

বিভিন্ন গ্রন্হ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তৎকালীন সময়ে এ উপজেলায় হিন্দু, মুসলমান জমিদার দের বসতি ছিলো। পর্যায়ক্রমে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোকজন প্রবাসে পাড়ি জমায় এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে উপজেলাকে সমৃদ্ধশালী করে তোলে। বর্তমানে বিশ্বনাথ থানা সিলেট জেলার এক অন্যতম উপজেলা হিসেবে প্রসিদ্ধ। বিশ্বনাথ উপজেলা সবার কাছে প্রবাসী অধ্যুষিত থানা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। দার্শনিক স্হান সমুহের মধ্যে রামপাশার বিখ্যাত দেওয়ান হাছন রাজার জমিদার বাড়ি, ৩৬০ আউলিয়ার সফর সঙ্গী হযরত শাহ কালু ও হযরত শাহ চান্দ-র মাজার, গৌরগবিন্দ দীঘি, উপজেলা পরিষদ শহীদ মিনার।

আলোকিত ব্যক্তিত্ব :— এডভোকেট নুরুল ইসলাম খান এমপি, আ ন ম সফিকুল হক রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী পরিষদের অতিরিক্ত সচিব মইন উদ্দিন, ইলিয়াছ আলী এমপি, শফিকুর রহমান চৌধরী এমপি, ইয়াহিয়া চৌধরী এমপি, রোশনারা আলী বাংলাদেশী বংশোদভূত বৃটিশ রাজনীতিবিদ, দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী- মরমী কবি ও সঙ্গীত শিল্পী, দেওয়ান একলিমুর রাজা চৌধুরী -রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যি, দেওয়ান তৈমুর রাজা চৌধুরী -রাজনীতিবিদ ও মরমী গীতিকার, রাগিব আলী-সমাজ সেবক ও শিল্পপতি, ডক্টর শাহদীন মালিক -আইনজীবি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, ডক্টর তুহিন মালিক -আইনজীবি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়া দেশে বিদেশে আরো অনেক গুনীজন আছেন যারা বিভিন্ন সেক্টরে সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছেন।

প্রবাসে বিশ্বনাথ সংগঠনগুলো নিজের থানা উন্নয়নে নিরলস কাজ অব্যাহত রাখছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উপজেলাটি যেমনই অনেক এগিয়ে আছে তেমনই চিকিৎসা সেবার ভূমিকা অপরিসীম।
এ উপজেলায় মোট ৪৩৬ টি গ্রাম আছে। তন্মধ্যে বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকার নাম সিঙ্গের কাছ। পাশ্ববর্তী অনেক গুলো গ্রাম যেমন শেখের গাউ,মাঝ গাউ,পশ্চিম গাউ, খান পাড়া,করপাড়া,কাজির গাউ গোয়াহরি ভাটিপাড়া খাগহাটা,বুরাইয়া,সিংরাওলী,নোয়াগাউ,সাতপাড়া,পলির গাউর প্রানকেন্দ্র হিসেবে সিংগের কাছ অতি সুপরিচিত। এলাকাটিকে একই বাক্যে সবাই চেনে। এখানে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা মসজিদ চিকিৎসা কেন্দ্র সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্নয়ে সমৃদ্ধশীল একটি এলাকা বলে খ্যাত।

সিংগের কাছের নামানুসারে বাজারের নামকরন হয়েছে সিংগের কাছ বাজার। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্গ জ্ঞানী গুনী জনের জন্ম স্হান সিংগের কাছ প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা বলে প্রসিদ্ধ। এই এলাকার অনেক লোক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রবাসীদের অর্থায়নে গড়ে ওঠেছে বিলাসবহুল অট্টালিকা। ব্যবসা বানিজ্য আয় রোজগারের দিক দিয়ে এলাকাটি পিছিয়ে নেই। স্হানীয় ব্যবসায়ীদের নিষ্টা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সিংগের কাছ বাজার বর্তমানে এলাকার উন্নতম বাজার হিসেবে গন্য করা হয়। বাজার সংলগ্ন মাকুন্দা নদীর ব্রিজ বাজারের অন্যতম আকর্ষন যা বাজারের পশ্চিম, উত্তর দক্ষিণ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চালের যাতায়াতের আমুল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। চলাচল ব্যবস্হা যেমনি উন্নতি হয়েছে তেমনি নদীর দু’পাড় ঘেষে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এলাকার মানুষের আর্থিক অবস্হা সচ্ছল হওয়ায় চাহিদাও বেড়ে গেছে। কল কারখানা, শপিং কমপ্লেক্স বিশাল আকারে দোকান-পাট ও চিকিৎসা ব্যবস্হা সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান গড়ে উঠায় সর্বসাধারণ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে।অত্যাধুনিক জিনিস পত্র কেনাকাটার জন্য এখন আর শহরে যেতে হয় না। সিংগের কাছ বাজার এবং এলাকায় সরকারী বেসরকারী অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্হাপিত হওয়ায় শিক্ষার মান দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে।

কিছুদিন পূর্বে প্রবাসীদের উদ্যোগে এলাকায় নতুন একটি হেলথ সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে। যার নামকরন হয়েছে সিংগের কাছ “হেলথ সেন্টার”। মনোরম পরিবেশে আধুনিক প্রযুক্তির সব ব্যবস্হা সমপন্ন সেন্টার টি ইতিমধ্যে সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। এখানে বিনা মুল্যে গরীব দুস্হদের চিকিৎসার ব্যবস্হা করা হবে। রাস্তাঘাট যাতায়াত ব্যবস্হা অতীতের তুলনায় অনেক উন্নীত করা হয়েছে। সিংগের কাছ থেকে সিলেট যাতায়াত ব্যবস্হা বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক সহজতর হয়েছে।

সিংগের কাছের অন্তরভুক্ত মাকুন্দা নদীর উত্তর পারের অদুরে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ বিজড়িত গ্রামের নাম হচ্ছে সিংরাওলী। আমার জন্মস্হান। যার সাথে আমার নাড়ীর সম্পর্ক। যেখানে আমার শৈশব কৈশোরের রঙ্গিন কিছু সময় কেটেছে। যে গ্রামের লন্ডন প্রবাসী আরেক কৃতিমান পুরুষ ছিলেন আমার বাবা মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী সিকন্দর আলী। যার অবদান এই ক্ষুদ্র পরিসরে লিখে শেষ করতে পারবো না। যিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত আলেম, সিংরাওলী স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষানুরাগী, বিশিষ্ট সমাজ সেবক সর্বজন পরিচিত এক উজ্জ্বল ব্যাক্তিত্বের অধিকারী। বিশ্বনাথ উপজেলার সিংগের কাছ এর সিংরাওলী গ্রামের মৌলভী সাব নামে এক বাক্যে দেশে বিদেশে সবার পরিচিত।

সিংরাওলী গ্রামের মাটির গন্ধ প্রতিনিয়ত আমাকে মোহিত করে। এই গ্রামের অলি গলি পথ দিয়ে কতো যে হেটেছি খেলেছি তা আজও স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। প্রাইমারী স্কুল শেষ করে সিংগের কাছ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়টা বেশ রোমাঞ্চকর। সেই থেকে সিংগের কাছ এর বাজার এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের সাথে আত্মার বন্ধন সব সময়ের। স্কুলের শিক্ষক ক্লাস মেট থেকে শুরু করে সবার সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। হাই স্কুলে অধ্যায়নরত অবস্হায় ৮ম শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়ে প্রবাসী হয়ে যাওয়ায় পিছনে ফেলে আসতে হয় স্বর্ণালী দিনগুলো। আজ শুধু সেই সব স্মৃতিময় দিনগুলো পিছু টানে। মনের আঙিনায় বার বার দোলা দেয়। প্রবাসের রঙীন চাকচিক্যময় জীবনে সুখ সাচ্ছন্দে ভরপূর হলেও জন্মভূমি তথা শেকড়ের টান প্রতিনিয়ত অনুভব করি। কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে হয়,
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্ম ভূমি”

লেখক : কবি, ইংল্যান্ড প্রবাসী।

তরুণ মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জেবউননেছা

55813667_257771258342570_1786844521284239360_nমুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ এবং অন্ধকারে থাকা মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয় আলোতে আনতে মুক্তিযুদ্ধের উপর গবেষণায় ইতিমধ্যে সাড়া জাগিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের মেধাবী সন্তান ড. জেবউননেছা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারপার্সন এই শিক্ষকের জন্ম যদিও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রায় দশ বছর পরে। তবে ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও অজানা অনেকগুলো বিষয় আলোতে এনেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের এই শিক্ষক দেশের নানা প্রান্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের সমৃদ্ধ ঘটনা ও ইতিহাস সংগ্রহ ও গবেষণার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের বিষয়গুলোও তিনি বেশ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রকাশিতব্য ‘এনসাইক্লোপেডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশনে’র বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা এন্ট্রি লেখক হিসেবে লিখেছেন এই তরুণ গবেষক। ২০০৯ সনে তাঁর সম্পাদিত প্রথম গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ: বুদ্ধিজীবির দৃষ্টিকোণ ও অভিজ্ঞতা’ গ্রন্থের মুখবন্ধের এক পর্যায়ে তিনি লিখেন, ‘পারিবারিকভাবে বাবার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে ভালোবাসতে হয় দেশকে। কিভাবে শ্রদ্ধা করতে হয় মুক্তিযোদ্ধাকে। আশি দশকের শেষের দিকে আমার বাবা কবি ও নাট্যকার মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া রচিত ‘টাকার পাহাড় চাই’ নাটকের একটি সংলাপ ছিল ‘জন্মদাতা, কর্মদাতা, শিক্ষাদাতার মতোই আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি দেশের মুক্তিদাতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের’। এই সংলাপটি তাঁর মনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা সৃষ্টি করেছিল।’ তবে ১৯৯৫ সনের দিকে নিজ এলাকা নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন।শিশু শিল্পী হিসেবে ছোটবেলা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা এবং নাটক পরিবেশন করে বেশ কিছু পুরস্কার কুঁড়িয়েছেন। তাঁর রচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী’ নামক গ্রন্থটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর রচিত ‘মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা’ প্রবন্ধ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ‘অগ্রপথিক’ মার্চ, ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। ‘একাত্তুরের যাত্রী’ নামক সংগঠন থেকে প্রকাশিত ‘একাত্তুরের নারী’ ম্যাগাজিনে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নারীদের নিয়ে লেখা ‘তোমাদেরকে জানাই সালাম’ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘টক শো’তে অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন সংগঠন থেকে আমন্ত্রিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বক্তব্য এবং সেমিনারে লেখা পাঠ করেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে আয়োজিত সেমিনারে ‘মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা’ নামক গবেষণাভিত্তিক লেখা পাঠ করেন। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নেটওয়ার্ক শিক্ষক হিসেবে গত ১০ বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেবার জন্য শিক্ষার্থীবৃন্দদের নিয়ে তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ পরিদর্শন করেন। তিনি প্রতিবছর ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও অভিযাত্রী আয়োজিত “অদম্য পদযাত্রা”য় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের “সমন্বয়ক” হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সম্পর্কে সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সত্যিকারের কাহিনী নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারী ফ্লিম করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, ধানমন্ডি সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের ‘টর্চার সেল’ মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ প্রকল্পে অন্তভূর্ক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে একনেকের অর্থায়নে একটি শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে। ড. জেবউননেছার প্রকাশিত গ্রন্থ-‘আলোকিত নারীদের স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ’ নামক গ্রন্থটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচী’র অন্তর্ভূক্ত। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরের রংপুর হাউসে অবস্থিত দু’জন শহীদ জালাল উদ্দিন হায়দার রানা এবং তৌফিক সাত্তার চুন্নার কবরকে শহীদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য কাজ করছেন। তিনি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের স্মৃতিকথা সম্বলিত ‘সূর্য সন্তানদের ৭১ এর স্মৃতি’ নামক গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। তিনি ১৯৫২ এর সত্যিকারের ইতিহাস নিয়ে মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া রচিত ‘বাংলা আমার বাংলা’ নামক একুশভিত্তিক নাটক সম্পাদনা করেন। উক্ত দুটি গ্রন্থ স্বনামধন্য প্রকাশনী “অনন্যা প্রকাশনী” থেকে প্রকাশিত হয়েছে।তিনি মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া রচিত ‘বঙ্গবন্ধু একুশ নির্বাচিত কবিতা’ নামক কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি তরুণ মুক্তিযুদ্ধ গবেষক হিসেবে বিনোদনধারা পারফরম্যান্স এ্যাওয়াড, বিশেষ সম্মাননা-২০১৪,আমরা কুঁড়ি পদক-২০১৪, বঙ্গবীর ওসমানী স্মৃতি পুরষ্কার -২০১৩ এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ (বাসাপ এ্যাওয়ার্ড)-২০১৩ অর্জন করেন।

অমুসলিম হয়েও রোজার উপর গবেষণা করে নোবেল জয়

nubelবিশ্বজুড়ে ১৬০ কোটি মুসলমান রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেদের নিবেদন করেন। তাঁদের এ আত্মনিবেদনের পেছনে থাকে না কোনো ইহলৌকিক চাওয়া। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিই কেবল চেয়ে থাকেন মুমিনরা। আল্লাহ তাআলাও মুমিনদের এ ভালোবাসাকে কবুল করে নিয়ে জান্নাতি প্রতিদান দিয়ে তাঁদের জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করে দেন। মুসলিমরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’সিয়াম’। খ্রিস্টানরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’ফাস্টিং’। হিন্দু বা বৌদ্ধরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’উপবাস’।

বিপ্লবীরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’অনশন’। আর, মেডিক্যাল সাইন্সে রোজা রাখকে বলা হয় ’অটোফেজি’।তবে মুসলিমদের রোজা রাখার ধরনের সাথে অন্যদের কিছু পার্থক্য আছে।

খুব বেশি দিন হয়নি, মেডিক্যাল সাইন্স ’অটোফেজি’র সাথে পরিচিত হয়েছে। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ’ওশিনরি ওসুমি’-কে অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে পুরষ্কার দেয়। এরপর থেকে আধুনিক মানুষেরা ব্যাপকভাবে রোজা রাখতে শুরু করে।

Autophagy কি? আসুন জেনে নিই।

Autophagy শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ। Auto অর্থ নিজে নিজে, এবং Phagy অর্থ খাওয়া। সুতরাং, অটোফেজি মানে নিজে নিজেকে খাওয়া।

না, মেডিক্যাল সাইন্স নিজের গোস্ত নিজেকে খেতে বলে না। শরীরের কোষগুলো বাহির থেকে কোনো খাবার না পেয়ে নিজেই যখন নিজের অসুস্থ কোষগুলো খেতে শুরু করে, তখন মেডিক্যাল সাইন্সের ভাষায় তাকে অটোফেজি বলা হয়। আরেকটু সহজভাবে বলি।

আমাদের ঘরে যেমন ডাস্টবিন থাকে, অথবা আমাদের কম্পিউটারে যেমন রিসাইকেল বিন থাকে, তেমনি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মাঝেও একটি করে ডাস্টবিন আছে। সারা বছর শরীরের কোষগুলো খুব ব্যস্ত থাকার কারণে, ডাস্টবিন পরিষ্কার করার সময় পায় না। ফলে কোষগুলোতে অনেক আবর্জনা ও ময়লা জমে যায়।

শরীরের কোষগুলো যদি নিয়মিত তাদের ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে না পারে, তাহলে কোষগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে শরীরে বিভিন্ন প্রকারের রোগের উৎপন্ন করে। ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের মত অনেক বড় বড় রোগের শুরু হয় এখান থেকেই।

মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, তখন শরীরের কোষগুলো অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তো আর আমাদের মত অলস হয়ে বসে থাকে না, তাই প্রতিটি কোষ তার ভিতরের আবর্জনা ও ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করে।

কোষগুলোর আমাদের মত আবর্জনা ফেলার জায়গা নেই বলে তারা নিজের আবর্জনা নিজেই খেয়ে ফেলে। মেডিক্যাল সাইন্সে এই পদ্ধতিকে বলা হয় অটোফেজি।

শুধুমাত্রএ জিনিসটা আবিষ্কার করেই জাপানের ওশিনরি ওসুমি ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কারটা নিয়ে গেল।

জানা গেছে, প্রোফেসর ওশিনরি নিজেও সপ্তাহে দুটি করে রোজা রাখেন।

জাতীয় কবি নজরুলের জন্মদিন আজ

60555‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান’…

আজ বুধবার ২৫ মে, ১১ জ্যেষ্ঠ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী। দ্রোহ, প্রেম ও সাম্যের কবি হিসেবেও বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভা নজরুল ইসলামকে অভিহিত করা হয়।

১৮৯৯ সাল, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এইদিনে বর্ধমান জেলার (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে) আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে নব জাগরণের এ কবির জন্ম।

জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় কবির ১১৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে নানা কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। এ বছর জাতীয় পর্যায়ের এই অনুষ্ঠান হচ্ছে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। কবির জন্মদিনের এ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ।

জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত ত্রিশাল, কুমিল্লায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলায়ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে নজরুলের জন্মবার্ষিকীতে।

বেসরকারি উদ্যোগেও রয়েছে নানা আয়োজন। ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে।

জাতীয় কবির জন্মদিনে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। জাতীয় সব দৈনিক কবির জন্মদিনে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। টেলিভিশন ও রেডিও প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলাম জনপ্রিয় হয়েছেন কবিতা ও গানে। ব্রিটিশ শাসকদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কবিতা ও গান লিখে বিদ্রোহী কবি হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসেন নজরুল ইসলাম। রচনা করেন ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙ্গার গান’র মতো কবিতা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রিটিশ সরকার কবিকে জেলে পাঠায়। সেখানে বসে কবি রচনা করেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলামের আবির্ভাবকে ধুমকেতুর আত্মপ্রকাশ হিসেবেও দেখেন অনেকে।

বহুমুখী প্রতিভার এ কবি বাংলা সাহিত্যের বিশাল অঙ্গনে ভূমিকা রাখেন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক হিসেবে। সাহিত্যকর্মের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে তার গান। প্রায় ৩ হাজার গান রচনা করেন নজরুল ইসলাম। ইসলামি গজল লিখে বাংলা গানে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করেন তিনি। গান রচনার পাশাপাশি সেগুলোতে সুরারোপ করে সমৃদ্ধ করেছেন সঙ্গীতাঙ্গনকে।

নাটক লিখেছেন, ছেলেবেলায় লেটো দলে যোগ দিয়ে নাটকে অভিনয় করেছেন, পরিণত হয়ে লিখেছেনও নাটক। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন, পরিচালনা এবং অভিনয়ও করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ছেলেবেলায় লেটো দলে শুরু হয় নজরুলের সাহিত্যচর্চা, যা পরিণতি পায় সৈনিক জীবন থেকে ফেরার পর। সৃষ্টির সময় মাত্র দুই দশক। যুদ্ধ থেকে ফিরে ১৯২২ থেকে ১৯৪২ সাল। স্বল্প এ সময়ে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নজরুলের অবদান অনন্য বলেও মত তাদের।

বরেণ্য এ কবি নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতা কাজী ফকির আহমেদকে হারিয়ে এলামেলো হয়ে যায় সামনে চলার পথ। আর্থিক অনটনে পড়ে বই-খাতা রেখে রোজগারে নেমে পড়তে বাধ্য হন নজরুল। কখনও মসজিদের ইমামতি, মাজারের খাদেমগিরি, চায়ের দোকানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে তাকে। ছেলেবেলায় তার নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’।

আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটির কাজ করার সময় সেখানে কর্মরত দারোগা রফিজ উল্লাহ’র সঙ্গে পরিচয় হয় নজরুলের। তিনি কিশোর নজরুল নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। এটা ১৯১৪ সালের কথা। মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন নজরুল ইসলাম। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।

১৯৪২ সালে আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়েন নজরুল। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভার এ কবি পিকস ডিজিজে আক্রান্ত। এক পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন চিরবিদ্রোহী এ কবি। এতে তার সাহিত্যচর্চা পুরোপুরি থেমে যায়।

কোলকাতায় পারিবারিক তত্ত্বাবধানে থাকা বাকরুদ্ধ এ কবিকে ১৯৭২ সালের ২৪ মে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রাখা হয় নজরুল ইসলামকে। অভিসিক্ত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায়।

চিরবিদ্রোহী এ কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ‘আজান’ কবিতায় চাওয়া শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয় চির জাগরণের এ কবিকে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন।

অপার সম্ভাবনাময় সিলেটের পর্যটন

সমতল ভূমির এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে খেলা করছে সাদা মেঘ। বৃষ্টি হলে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণাধারার জলে চিকচিক করে সূর্য। অনতিদূরে হাওর। হাওরের বুকে নানা জাতের পাখির ডুবো খেলা। পাহাড়-সমতল-জলাভূমির এমন অপূর্ব সৌন্দর্যের দেখা মেলে কেবল সিলেটে। এ অঞ্চলের মাটির নিচে প্রকৃতি যেমন লুকিয়ে রেখেছে মূল্যবান সম্পদ তেমনি উপরে মেলে ধরেছে তার অপরূপ সৌন্দর্য। আর শাহজালালের (রাহ.) চরণ স্পর্শে এ অঞ্চলে তৈরি হয়েছে আধ্যাত্মিকতার ছায়াময় পরিবেশ। জালালি কইতরের ডানা ঝাপটানো আর বাক-বাকুমে ঘুম ভাঙে এখানকার অধিবাসীদের, কমলা লেবু আর চায়ের পাতার ঘ্রাণ পাগল করে তোলে তাদের হৃদয়। প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠা এ জনপদের মানুষের কণ্ঠে তাই খেলা করে প্রকৃতিরই সুর। তাই সুরমার তীর ভরে উঠে হাছন-রাধা রমন আর করিমের দরাজ কণ্ঠে। সব মিলিয়ে হাজার বছরের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যে লালিত এ জনপদ তাই সারা দেশের কাছে পরিচিত পর্যটন নগরী হিসেবে। প্রকৃতির উদারতা সিলেটকে করেছে পর্যটনসমৃদ্ধ। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে এ সম্ভাবনার বিকাশ ঘটছে না। পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব হলে এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হতো বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেটের পর্যটনের বিচিত্রতা :
সিলেট পর্যটনে অপার সম্ভাবনারই এক প্রতিশব্দ। যুগে যুগে এই জনপদের রূপ-লাবণ্যের টানে ছুটে এসেছেন পর্যটকেরা। বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা, রূপ পিয়াসী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে নেই সে তালিকায়। সিলেটের রূপে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ জনপদের নাম দিয়েছিলেন ‘শ্রীভূমি’। বৈচিত্র আর সৌন্দর্যের কারণে সিলেটের পর্যটন ক্ষেত্রগুলোর আকর্ষণ কখনওই ফুরোবার নয়।

রূপের খনি :
প্রকৃতি যেনো সিলেটকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে। সৌন্দর্যের ভা-ার এখানটাতে উপুড় করে দিয়েছে প্রকৃতি। অকৃপণ হাতে সাজিয়েছে এই অঞ্চলের রূপ-লাবণ্য। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো একধাপ বর্ণিল করেছে উত্তরে ভারতের প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পর্বতমালা। সিলেটে বেড়াতে এসে পর্যটকরা সীমান্তের ওপারের বাড়তি সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন খুব সহজেই। প্রকৃতিকন্যা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জাফলং বেড়াতে এসে পর্যটকরা হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান খাদিম রেইন ফরেস্ট, পান্না সবুজ জলের লালাখাল, দেশের প্রথম সমতল চা বাগান, তামাবিলস্থ গ্রিনপার্ক এবং পাহাড়, নদী ও জলধারার অপূর্ব মিশেল পাংথুমাইয়ে। আর বাড়তি পাওনা-বর্তমানে দেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ রাতারগুল। এশিয়ার ২৬টি জলাবনের অন্যতম গোয়াইনঘাটের রাতারগুল না দেখলে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ অসম্পূর্ণ থেকে যাবারই কথা। উত্তরে সিলেট নগরীর সীমানা পেরুলেই দেখা যাবে থরে থরে সাজানো চা বাগান। লাক্কাতুরা, মালনিছড়া আর তারাপুর চা বাগানে নারী শ্রমিকদের চা চয়নের দৃশ্যে স্থির হয়ে যায় পর্যটকের চোখ। সিলেটজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোও আলাদা দেশের অন্য এলাকা থেকে। কোনটা স্বচ্ছ জল, কোনটা সীমান্তরেখা বরাবর বয়ে চলা অথবা কোনটা পাথর কোয়ারির জন্য পর্যটকদের চোখ আটকে রাখে। আর সমুদ্রসম হাকালুকি হাওরের মায়া কাটানো কি সম্ভব।

সিলেটের মতো টিলা, পাহাড়, ঘনসবুজ বন আর চা বাগানে সাজানো না হলেও সুনামগঞ্জে প্রকৃতি তার উদারতা মেলে ধরেছে বিশাল জলরাশির মাঝে। তাইতো টাঙ্গুয়ার হাওর ইতোমধ্যে পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি সমূদ্র’ হিসেবে। আর তাহিরপুরের যাদুকাটা বা বারেক টিলার সৌন্দর্যের টানে পর্যটকরা দূর্গম পথে পা বাড়াতেও দ্বিধা করেন না।

সিলেটের ঐতিহ্য চা আর কমলা ভা-ারের প্রকৃত রূপ দেখতে হলে যেতে হবে মৌলভীবাজারে। শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুন্ড, পরিকুন্ড, হামহাম মৌলভীবাজারের পর্যটনকে অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। আর এর সবটুকুই কেবল প্রকৃতির কল্যাণে। সিলেট বেড়াতে এসে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত দেখতে না পারলে অতৃপ্ত থেকে যান পর্যটকরা। আর হবিগঞ্জে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান- সে প্রকৃতির আরেক উদারতা, বিচিত্রতা।

ঐতিহ্যের পরশ :
সিলেটর গায়ে গায়ে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের বাক বদলের নানা গল্প। সিলেটজুড়ে ইতিহাসের নানা নিদর্শন এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সিলেটের মধ্যখানে শুয়ে আছেন সিলেট বিজয়ী বীর সাধক হযরত শাহজালাল (রাহ.)। পথে পথে ছড়িয়ে আছে তার সিলেট বিজয়ের স্মারক। সিলেটের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে খুঁজে মিলবে না শাহজালালের সফরসঙ্গীর সমাধি। শাহজালালের কাছে পরাজিত গৌড়ের রাজা গৌবিন্দের রাজ প্রাসাদের চিহ্ন এখনও টিকে আছে নগরীতে। আছে তার পালিয়ে যাওয়ার পথের চিহ্নও। জৈন্তার প্রতাপশালী নারী রাজ্যের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জৈন্তা রাজবাড়ি। এখানে টিকে থাকা মেগালিথিক পাথরের নিদর্শন আজও জানান দিচ্ছে সিলেটের প্রাচীনত্বের।

জামালগঞ্জের এমরুল কয়েস লোক উৎসব আগামী ১৬ মার্চ

DSC08471আগামী ১৬ মার্চ সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার বিছনা গ্রামে বসতে যাচ্ছে ১৬তম এমরুল কয়েস লোক উৎসব। ভোর ৬টা থেকে এ উৎসব সারাদিন চলবে। এবারের এ উৎসব উদ্বোধন করবেন সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার নির্বাচনী এলাকার সংরতি মহিলা আসনের এমপি এডভোকেট শামসুন্নাহার বেগম শাহানারা রব্বানী। উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সুনামগঞ্জ- ১ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। সভাপতিত্ব করবেন লোক উৎসবের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এমরুল কয়েস।
সারাদিন ব্যাপী লোক উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বাউলরা বাউল গান পরিবেশন করবেন। এবং উৎসবে শতকণ্ঠ সংকলনের মোড়ক উন্মোচন করা হবে। উৎসবে সকল ভাবুকপ্রাণ মানুষকে উপস্থিত থাকার জন্য উৎসবের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এমরুল কয়েস সবিনয় অনুরোধ জানিয়েছেন।

সিলেটের ‘নাগা মরিচের’ ঝাল বিদেশে!

সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত নাগা মরিচ এখন রফতানি হচ্ছে যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে। প্রতিবছর বিশেষ জাতের এই মরিচ রফতানি করে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মূদ্রা আহরিত হচ্ছে। ঝাল ও সুগন্ধের জন্য ২০০৭ সালে এ মরিচটি গিনেজ বুকে নাম লিখিয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, চাষীদের মাঝে সচেতনাবৃদ্ধি ও পরিকল্পিত চাষাবাদ হলে এ খাত থেকে বছরে শতকোটি টাকার উপরে আয় করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘নাগা মরিচ’ মরিচের বিশেষ একটি প্রজাতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ‘কামরাঙা মরিচ’ ও ‘বোম্বাই মরিচ’ নামেও পরিচিত। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া ভারত ও শ্রীলংকায় প্রচুর পরিমাণে ‘নাগা মরিচ’ চাষ হয়ে থাকে। ভারতে এ মরিচ ‘ভূত জোলেকিয়া মরিচ’ ও শ্রীলংকায় ‘নাই মিরিচ’ নামে পরিচিত।

সিলেট তথা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে ‘নাগা মরিচ’ রফতানি শুরু হয় ২০১১ সাল থেকে। ঝাল ও গন্ধের জন্য প্রবাসী বাঙালি ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় লোকজনের মধ্যে এটি উন্নতমানের মসলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বিভাগের মধ্যে সিলেটের বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোলাপগঞ্জ, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল এবং হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ, মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে ‘নাগা মরিচ’ চাষ হয়ে থাকে।

সিলেটের চাষীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়- লেবু, আনারস ও কমলা বাগানেই ‘নাগা মরিচ’ চাষ হয়ে থাকে। বাগানের অন্য গাছের ফাঁকে ফাঁকে মরিচের চারা লাগানো হয়। ফলে উৎপাদন ও পরিচর্যা খরচ কম পড়ে। ‘নাগা মরিচ’ চাষীরা জানান- প্রতি একর মরিচ চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর মরিচ বিক্রি করে আয় হয় ৭০-৮০ হাজার টাকা। পাইকারী ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে প্রতিশ’ মরিচ ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনে আনেন। পরে তারা ভালো আকার ও রঙের মরিচগুলো রফতানির জন্য আলাদা করেন। অপেক্ষাকৃত ছোটগুলো বিক্রি করা হয় স্থানীয় বাজারে।
সিলেটের গৃহিণীরা বিভিন্ন রকম সবজীর সাথে ‘নাগা মরিচ’ রান্না করেন। এছাড়া নাগা মরিচের নানা পদের আচারও তৈরি করা হয়।

দেশের বাইরে নাগা মরিচের সবচেয়ে বেশি চাহিদা যুক্তরাজ্যে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার প্রতিটি সুপারশপে এ মরিচ পাওয়া যায়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, সৌদি আরব, দুবাই ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে নাগা মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নাগা মরিচ সবজী হিসেবে বিদেশে রফতানি হয়ে থাকে। তাই প্রতিবছর কত টাকার মরিচ রফতানি হয় তার সঠিক হিসেবে নেই। তবে রফতানিকারকদের ধারণা প্রতিবছর সিলেট থেকে ২০-৩০ কোটি টাকার নাগা মরিচ রফতানি হয়ে থাকে।

জালালাবাদ ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রোজেন ফিশ রফতানিকারক গ্র“পের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমদ জানান- যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে সিলেটের নাগা মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী রফতানি করতে না পারায় বিদেশে এ ফলটির বাজার দখল করে নিচ্ছে ভারত ও শ্রীলংকা। ‘ক্যাংক্রার্স’ জটিলতার কারণে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নাগা মরিচ রফতানি করতে ব্যবসায়ীদের প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে। সরকার উদ্যোগী হলে নাগা মরিচ রফতানি করে বছরে শতকোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

যেখানে বিয়ের আগেই মা হতে হয়!

ডেস্ক রিপোর্ট : যৌন সম্পর্কের বৈধতা দিয়ে থাকে বিবাহ। এটা সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি। তবে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় টোটো সমাজে। সেখানে বিয়ের আগেই নারীকে গর্ববতী হতে হয়। টোটো ভারতের এক অতি ক্ষুদ্র জন গোষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার উত্তর প্রান্তে ভুটান সীমান্তে তোর্ষা নদীর ধারে টোটোপাড়া গ্রামে এঁদের বাস।

সে অঞ্চলে মেয়েদের বিয়ের আগে মা হওয়াটা কিন্তু বাধ্যতামূলক। সেখানে মাতৃত্বই দেয় পছন্দের সেই পুরুষকে বিয়ের অধিকার। এটাই রেওয়াজ টোটো সমাজে। সেখানে সবমিলিয়ে ১ হাজার ৫৮৪ টোটোর বাস। এখনো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন এই উপজাতিরা।

টোটো সমাজের পুরুষদের কোনো মেয়েকে বেছে নেয়ার অধিকার রয়েছে। ছেলেটির পছন্দ হলে প্রথমে ছেলের বাবা মেয়ের বাবার বাড়িতে দু’হাঁড়ি ‘ইউ’ ও একটা লাল মুরগি নিয়ে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। একে বলে ‘বাগদান’ পর্ব। আগে সাত-আট বছর হলেই বাগদান পর্ব সেরে ফেলা হতো। তারপর কয়েকবছর পর মেয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে আসতো এবং স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতো। মেয়ে গর্ভবতী হলেই বিয়ের পর্ব সারা হতো। অনেকসময় বাগদানের পরেই মেয়ে ছেলের বাবার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি চলে আসে। নিজেদের পছন্দমতো বিয়ের ব্যাপারটা টোটো সমাজে অনেক আগে থেকেই প্রচলিত আছে। এই ধরনের বিয়েকে বলা হয় ‘নিয়াংকোষা’প্রথা।

টোটোদের মধ্যে পণপ্রথা নেই। বিবাহ বিচ্ছেদ বা বিধবা বিবাহ বরাবরই স্বীকৃত। তবে এইসব বিষয়ে সমাজ কতগুলি নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। কোনো অবস্থাতেই টোটো সমাজ ব্যাভিচারিতা সহ্য করে না। এক্ষেত্রে সমাজপতিদের শাসন বড় কড়া। তবে শিক্ষার উন্নতি হওয়ার ফলে আগের অনেক নিয়মই এখন শিথিল হয়েছে।

Developed by: