আজ ২১ আগস্ট। ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ‘দেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে’ আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়। এতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের তিন শতাধিক নেতাকর্মী এ হামলায় গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনার পর মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে ওই থানায় পৃথক তিনটি এজাহার দায়ের করেন। দীর্ঘ দশ বছরেও গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কার্য শেষ হয়নি। এখনো চলছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্ব।
সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকেল পাঁচটায় পৌঁছালে একটি ট্রাকের উপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বেশি বক্তৃতা দেয়া শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরো ১২ জন নিহত হন।
২০০৮ সালের ১১ জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সিনিয়র সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট ফজলুল কবির। এ অভিযোগপত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনক্রমে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এবার মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই প্রথম অভিযোগপত্রের ২২ জন ছাড়াও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
চার্জশিটভুক্ত ৫২ জনের মধ্যে তাজউদ্দিন ৯ নম্বর আসামি। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) অন্যতম শীর্ষ নেতা। তাজউদ্দিনের ভাই বিএনপি সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। তিনি নিজেও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। এই মামলার আরেক চার্জশিটভুক্ত আসামি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই মামলায় বর্তমানে সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হরকাতুল জেহাদ প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান কারাগারে রয়েছেন। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক এবং খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডির সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদও এ মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ সকল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় আট আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরা হলেন- মুফতি হান্নান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান সুমন ও রফিকুল ইসলাম সবুজ।
আসামিরা কে কোথায় রয়েছেন: ৫২ আসামির মধ্যে পুলিশ ১৯ জনকে পলাতক দেখিয়েছে। এরমধ্যে তারেক রহমান লন্ডনে ও হারিস চৌধুরী ভারতের আসামে রয়েছেন। এছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ ব্যাংককে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ কলকাতায়, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন যুক্তরাষ্ট্রে, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোরসালিন ভারতের জেলে রয়েছেন। জঙ্গি নেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার এবং মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান ও উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) খান সাইদ হাসান বিদেশে অবস্থান করছেন।
তদন্তে উল্লেখ করা হয়, ওই হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা।
গ্রেনেড সরবরাহকারীর অবস্থান শনাক্ত: হামলায় গ্রেনেড সরবরাহকারী ও মামলার পলাতক আসামি মাওলানা তাজউদ্দিনের অবস্থান সনাক্ত করেছে ইন্টারপোল। বর্তমানে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছেন। গতকাল মঙ্গলবার তার অবস্থানের কথা জানিয়ে ইন্টারপোল থেকে পুলিশ সদর দফতর ইন্টারপোল শাখায় (এনসিবি) ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (অপারেশন) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, ই-মেইল পাওয়ার পর তাকে ফেরত আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইন্টারপোলের কাছ থেকে ই-মেইল বার্তার পরেই তাজউদ্দিনকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় চার্জশিটভুক্ত ৫২ আসামির মধ্যে বর্তমানে ১৯ জন বিদেশে অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের তালিকা ইতোমধ্যেই ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের কারাগারে আটক আসামিরা জামিনে বের হলে কেউ যাতে দেশ থেকে পালাতে না পারেন সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।