
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপি নেতা মুজিব অপহরণ ঘটনার তদন্ত মোড় নিয়েছে ভিন্নদিকে। দুটি ভিডিও ফুটেজ আর অপহৃতদের রহস্যময় আচরণে ঘুরে যাচ্ছে তদন্তের চাকা। চালক রেজাউল হক সোহেলসহ তিনি আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা ‘পুরোপুরি’ বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। গণমাধ্যমেও মুজিব অপহরণ ও মুক্তিসংক্রান্ত যে তথ্য জানিয়েছেন, তাতেও রয়েছে গরমিল। কিন্তু পুলিশের তদন্তে মিলেছে ‘ভিন্ন কিছু’। অপহরণকারীদের দেড় কোটি টাকা পণ দিয়েই মুজিব মুক্ত হয়েছেন, এমন তথ্যই জোরালো হচ্ছে। মুজিব সুনামগঞ্জ বিএনপির নেতৃত্ব পেতে এমন ঘটনা ‘সাজিয়েছেন’ বলেও রয়েছে আলোচনা। আর তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জড়িয়ে নানা কাহিনী তিনি প্রচার করছেন- পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা এমনটাই। কিন্তু এ বিষয়ে মুজিব কিছু বলতে নারাজ।সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ বলেন, বন্দিকালীন মুজিবের পরিবারের কাছে দুটি ভিডিও পাঠায় অপহরণকারীরা। এর একটিতে তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে উদ্ধারের জন্য বলেছেন। অন্য ভিডিওতে তিনি অপহরণকারীদের সঙ্গে উর্দুতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। এসব ভিডিও পুলিশকে দিয়ে পরিবারের লোকজন সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু ভিডিও বার্তায় উল্লিখিত মুক্তিপণের ডেটলাইনের পর পরিবারের সদস্যরা আর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। অবশেষে গত ১৮ আগস্ট রহস্যজনকভাবে গাড়ি চালকসহ মুজিব মুক্তি পান। এখন প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে সিআইডি তদন্ত করছে।পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, দুটি ভিডিও ফুটেজ লন্ডনে বসবাসরত তাঁর পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। মুক্তিপণ আদায়ে অপহরণকারীরা তা করেছিল বলে ধারণা। একটি ফুটেজে চোখ বাঁধা অবস্থায় দেখা গেছে মুজিবকে। তিনি উদ্ধার পেতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলে ও স্ত্রীর কাছে আকুতি জানাচ্ছেন। আর আরেকটি ফুটেজ উর্দু ভাষায় রেকর্ড করা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যবসার টাকা নিয়ে মাফিয়াদের হাতে তিনি অপহরণ হয়েছেন- এ রকম ইঙ্গিত রয়েছে এ ভিডিওতে। অপহরণকারীদের পাঠানো ভিডিও বার্তা অনুসারে গত ৩০ জুলাই ছিল মুজিবের জন্য মুক্তিপণ দেওয়ার শেষ দিন।এ মুক্তিপণের বিষয় ও তারিখ যুক্তরাজ্য থেকে সুনামগঞ্জ পুলিশকে জানিয়েছিলেন তাঁর স্বজনরা। অপহরণকারীদের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে কথা বলতে জুলাই মাসে মুজিবের ছেলে রিপন রহমান হাশমি তিন দিনের সফরে দেশে এসেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, মুক্তিপণের টাকা নিয়েই তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেশে আসেন। অপহরণকারীরা দেড় কোটি টাকা কেন মুক্তিপণ দাবি করেছিল, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এরপর ১৮ আগস্ট সকালে টঙ্গীতে পাওয়া যায় গাড়ি চালকসহ মুজিবকে। তিনি ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন এবং গণমাধ্যমে এ অপহরণ ঘটনা নিয়ে নানা কথা বলেন। অন্যদিকে গাড়িচালক সোহেল বাড়ি ফেরার কথা বলে দীর্ঘ সময় পালিয়ে থাকেন। যা ঘটনার রহস্য বাড়িয়ে দেয়।অন্যদিকে গত ৩০ জুলাইয়ের পর থেকে মুজিবের মুক্তির আগ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা আর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। মুক্তি-পরবর্তী নানা ঘটনা এবং চালক ও মুজিবের বক্তব্যের গরমিলে এ অপহরণের তদন্তে নেমে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পণের বিনিময়ে ‘মুক্তি’ পেলেও মুজিব রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ও আগামীতে জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা পেতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জড়িয়ে নানা তথ্য দিচ্ছেন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
গত বৃহস্পতিবার আদালতের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে মুজিব মুক্তিপণের বিষয়ে কিছু বলেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্যে চালক ও মুজিবের বক্তব্যে অনেক ‘ফারাক’ আছে বলেও তদন্তকারীদের দাবি। এ দুজন আলোচিত অপহরণ ঘটনা ও মুক্তির আলামত নষ্ট করেছেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মুজিবের দেওয়া তথ্য অনুসারে গত ১৮ আগস্ট টঙ্গীর ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় বোরকা পরা অবস্থায় চালক ও মুজিবকে ফেলে যায় অপহরণকারীরা। সেখানে তাঁরা চোখের বাঁধন খুলে পরস্পরকে দেখেন এবং একটি সিএনজি বেবিট্যাক্সি নিয়ে মুজিবের শ্যালক ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের গুলশানের বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। পথে গুলশান-১ থেকে চালক রেজাউল হক সোহেলকে এক হাজার টাকা দিয়ে সুনামগঞ্জে পাঠিয়ে দেন মুজিব। সন্ধ্যায় তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন এবং পুলিশকে মুক্তির বিষয়টি জানান। ওই দিনই তাঁর শ্যালক ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনও হঠাৎ চলে আসেন যুক্তরাজ্য থেকে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মুজিব অপহরণ ও মুক্তি ঘটনায় দুটি ভিডিও ফুটেজের বাইরেও রহস্যজনক নানা তৎপরতার তথ্য মিলেছে। ১৮ আগস্ট উদ্ধার হলেও চালক রেজাউল হক সোহেল ১৭ আগস্ট দুপুরেই রাজধানীতে একটি আবাসিক হোটেলে একটি ঘর ভাড়া নেন বলে জানা গেছে। এর আগে তিনি একটি স্টুডিওতে ছবি তোলেন। পরে ঘুমিয়ে পড়েন চালক। এ-সংক্রান্ত প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পুলিশকে মুজিব জানিয়েছেন, তাঁকে সিলেটের টুকেরবাজার থেকে অপহরণ করা হয়েছে। আর চালক সোহেল জানিয়েছেন, চানপুর থেকে তাঁদের অপহরণ করা হয়। উদ্ধারের ঘটনাস্থল নিয়েও ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন দুজন। তাঁরা উদ্ধারের সময় বোরকা, জুতা ও মোজা পরিহিত ছিলেন জানালেও তা ফেলে দিয়েছেন বলে দাবি করছেন। উদ্ধারের পর কেন তাঁরা পুলিশের সহায়তা নিতে চাননি, তাও রহস্যজনক।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জে দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদার বলেন, মুজিব ও গাড়িচালকের বক্তব্যে গরমিল আছে। আর মুজিব একেক সময় একেক কথা বলছেন। তিনি তদন্তে সহযোগিতা না করে উল্টো বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। মূলত অপহরণ ও মুক্তির বিষয়ে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। এর পরও তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
গত ৪ মে যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসভাপতি ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান গাড়িচালক সোহেলসহ অপহরণের শিকার হন। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর পুলিশ-র্যাবের সহযোগিতা ছাড়াই তিনি মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন।