দৈনিক প্রথম আলো ১৩ মার্চ ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘নিউইয়র্কের বইমেলায় অংশ নেবে না প্রকাশক সমিতি’ শীর্ষক বিজ্ঞপ্তিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা ২০১৫ আহ্বায়ক বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বেতার ও টেলিভিশন সাংবাদিক এবং ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার এবং বইমেলা ২০১৫ প্রধান সমন্বয়কারী বিশ্বজিত সাহা। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক স্টেট কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’ একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলা ও বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের নিরলস প্রচেষ্টায় নিবেদিত। বাংলাদেশে প্রকাশনাজগতের পথিকৃৎ প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত ‘মুক্তধারা’ একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশনা সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’ বাংলাদেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রকাশনা সংস্থা ‘মুক্তধারা’-র সাথে কোনোভাবেই যুক্ত নয়। কারণ ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’ নিউইয়র্ক স্টেট কর্তৃক নিবন্ধিত একটি অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান।
‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’ বিশ্বপরিমণ্ডলে আবহমান বাংলা ও বাঙালির মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যধারাকে সমুন্নত রাখার কাজ নিয়োজিত। তাই প্রতিষ্ঠানটি তার নাম বেছে নিয়েছে ‘মুক্তধারা’। গত ২৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাভাষার বই, পত্র-পত্রিকা, বাংলা অডিও-ভিডিও, চলচ্চিত্র ইত্যাদি বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রচারণা ও বিপণনের দায়িত্ব পালন করে চলেছে। প্রতিবছর বাংলা বইমেলা ও বাংলা উৎসব আয়োজনও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কর্মসূচি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যারা ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত, তাদের অনেকেই ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’-এর আমন্ত্রণে বাংলা উৎসব ও বইমেলায় যোগ দিয়েছেন। নিজেদের প্রকাশনাসহ পরিবার পরিজন নিয়ে তারা আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থেকেও গেছেন।
উল্লেখ্য, ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’ উত্তর আমেরিকায় বাংলাভাষা, সাহিত্য ও শিল্প প্রসারে ১৯৯১ সাল থেকে বিরামহীন প্রচেষ্টায় নিয়োজিত। এই প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সহযোগীর চেষ্টায় ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর আমেরিকায় জাতিসংঘ সদরদপ্তরের সামনে অস্থায়ী শহিদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। একই বছর থেকে বহির্বিশ্বে সর্বপ্রথম বাংলা বইমেলার আয়োজনও করে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে: বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদ্যাপন, গুণিজন সংবর্ধনা, সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের আলোকে সেমিনার সিম্পোজিয়াম। ২০০১ সালে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যভিডিওচিত্র ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ প্রকাশ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ডিভিডিটি উদ্বোধন করেন। পরে ‘সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ’ নামেও একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশিত হয়। ২০০৭ সাল থেকে ‘বাংলা বইমেলা’ রূপান্তরিত হয় ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা’-য়। বর্ধিত কলেবরে বাংলা বইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন হস্ত ও কুটিরশিল্প, জামদানি শাড়ি, নকশিকাঁথা ইত্যাদিও উৎসবে স্থান পেতে শুরু করে। আমরা মনে করি, এভাবে আবহমান বাংলা ও বাঙালির কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সম্মিলন আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলাকে আরও বর্ণাঢ্য করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্যোগকে ‘বারোয়ারি’ প্রয়াস বলে উপহাস করা হয়েছে, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে। অথচ বইমেলাকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভেবে উৎসবে যোগদানকারী অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর স্টল থেকে প্রাপ্ত অর্থে সৃজনশীল প্রকাশকদের বিনামূল্যে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। বইমেলায় কলকাতার বইয়ের প্রাধান্য নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে যোগ দেয়া ৯টি প্রকাশনা সংস্থার প্রতিটিই ছিল বাংলাদেশে প্রকাশনা সংস্থা ও বিপণন প্রতিষ্ঠান। উত্তর আমেরিকার বইমেলায় গত ২৩ বছরে যোগদানকারী প্রায় দুই ডজন প্রকাশনা সংস্থার মধ্যে কলকাতার প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা ছিল মাত্র ৫টি। তবে এই মেলাটি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ প্রদর্শনীর অবাধ সুযোগ দিয়ে থাকে। কাজেই মেলায় কলকাতার বইয়ের আধিক্য বলে প্রকাশিত বিবৃতিটি বিভ্রান্তিকর।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’-এর বাংলা উৎসব ও মেলাকে সহযোগিতার জন্য যখন হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তখন একটি গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। আমাদের বিনীত প্রশ্ন, বাংলাদেশের কোনো প্রকাশক সমিতি কি আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলার আয়োজক মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ দাবি করার ক্ষমতা রাখে? নিউইয়র্কের বইমেলায় প্রকাশক সমিতি অংশ নেবে কিনা, এটা তাদের একান্তই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। বিজ্ঞপ্তিতে বইমেলায় অংশ নিয়ে কেউ প্রতারিত হলে সমিতি তার দায় দায়িত্ব নেবে না বলা হয়েছে। এই সমিতি কি গত ২৩ বছরে এ ধরনের কোনো দায়-দায়িত্ব পালন করেছে? উল্লেখ্য, এ বছরও বাংলাদেশের স্বনামধন্য ২১টির বেশি সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা মেলায় যোগ দেয়ার আবেদন করেছে। এবারের বইমেলায় বাংলাদেশের প্রায় ২০০০ নতুন বই প্রদর্শিত হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় এ বছর ২২, ২৩ ও ২৪ মে নিউইয়র্ক, ২৯ ও ৩০ মে ভার্জিনিয়া এবং ৩১ মে নিউজার্সিতে আন্তর্জাতিক বাংলা ও বইমেলা উদ্যাপন করা হবে। এ বছর প্রকাশকরা আমেরিকার ৩টি শহরে ৩টি বইমেলায় বিনামূল্যে তাদের সৃজনশীল গ্রন্থ প্রবাসী বাঙালিদের হাতে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
‘আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা’ ২০১১ সালে নিউইয়র্ক স্টেট গভর্নর কর্তৃক ‘ইন্টারন্যাশনাল বাংলা ফেস্টিভ্যাল উইক’ ঘোষণার গৌরবময় সম্মাননা অর্জন করেছে। ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’-এর প্রস্তাবনায় সাড়া দিয়ে নিউইয়র্ক স্টেট এবছরই প্রথমবারের মতো একুশে ফেব্র“য়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যা আমেরিকার ইতিহাসে বিরল ঘটনা। চলতি বছর এই উৎসব ও বইমেলা আয়োজনের জন্য ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দারকে আহ্বায়ক করে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট উৎসব উদ্যাপন কমিটির নির্বাচন করা হয়েছে। ইতোপূর্বে ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ, নাট্যজন জামালউদ্দীন হোসেন, নাসিমুন নাহার নিনি, ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ড. নূরননবী, হাসান ফেরদৌস, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ প্রমুখ বাংলাভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকর্মের কৃতী ব্যক্তিত্ব এই দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’-এর সকল কর্মসূচির মূলে রয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বসবাসরত এক ঝাঁক তরুণ কবি, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক ও সাহিত্যামোদী। তারা প্রায় সকলেই গত ২৪ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটির সাথে যুক্ত। নিউইয়র্কে ‘বাঙালির চেতনা মঞ্চ’-র সাথেও ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ইঙ্ক’ যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে। প্রতিবছর বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীদের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা’ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগ সম্পর্কে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে তাই আসুন বাংলাভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকর্মকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার মহৎ কর্মযজ্ঞে দল-মত নির্বিশেষে সবাই একত্রিত হই।

