ঢাকা উত্তরের প্রথম নগরপিতা আনিসুল হক নির্বাচিত

167e1cb0813920d59228337869a2d433বঙ্গবন্ধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। বুধবার ভোর পৌনে ৭টার সময় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অবস্থিত রিটার্নিং অফিসার মো. শাহ আলম ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্র থেকে ১০৯৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে সবগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে বেসরকারিভাবে আনিসুল হককে উত্তরের মেয়র হিসেবে ঘোষণা করেন।

টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা আনিসুল হক উত্তর সিটির ১ হাজার ৯৩ কেন্দ্র থেকে মোট ভোট পেয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭টি। তার নিকটতম প্রতিন্দ্বিন্দ্বি ছিলেন বাস প্রতীকের বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়াল। মঙ্গলবার দুপুরে ভোট বর্জন ও রাতে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানানো তাবিথ পেয়েছেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০টি ভোট।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একযোগে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিন সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা নিরুষ্কুষ বিজয় লাভ করে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৩৬টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১২টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ২৪ হাজার ৭০১ জন ও নারী ভোটার ১১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৩ জন। উত্তরে ১ হাজার ৯৩টি ভোটকেন্দ্রে ৫ হাজার ৮৯২টি ভোটকক্ষে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন ১৬ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৮১ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৮৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে মোট ১০৯৩টি ভোটকেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট আনিসুল হক এর আগে ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ দুই সংগঠন এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মনোনয়নপত্র কেনার আগ থেকেই আনিসুল হক ছিলেন সংবাদের শিরোনামে। ঢাকা উত্তরের প্রায় ৭৬ হাজার নাগরিকের সমস্যা চিহ্নিত করতে জরিপও করেন তিনি। সেই জরিপের ভিত্তিতে তিনি তার নির্বাচনী স্লোগান নির্ধারণ করেন ‘সমস্যা চিহ্নিত- এবার সমাধানযাত্রা’। একই সঙ্গে তিনি ঢাকাকে আধুনিক ও মানবিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সাবেক ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হকের এটাই প্রথম কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন। টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক হিসেবে সুবক্তা খ্যাতি পাওয়া আনিসুল প্রচারণা প্রথম দিন থেকেই নজর কাড়েন ভোটারদের। ২০ দিনের প্রচারণায় প্রতিদিনই নিত্য নতুন আঙ্গিকে তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফেরেন। কখনো রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে, কখনো আবার ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে। উত্তরের ১৬ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বয়োজেষ্ঠ্য আনিসুল হক নিজের তারুণ্য প্রমাণ করতে রাজপথেও ‘লম্বা রেস’-ও অংশ নেন। সেই সঙ্গে সব বয়সী ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে তিনি মিলেমিশে একাকার হয়ে তাদের মন জয় করেন। তার প্রচারণা শ্রেষ্ঠ দিক ছিল- বিপক্ষ প্রার্থীদের নিয়ে কোন কটু কথা না বলা।

আনিসুল হকের ছয় প্রতিশ্রুতি
ঢাকা উত্তরবাসীর জন্য নিজের ইশতেহারে ছয়টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আনিসুল হক। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- পরিচ্ছন্ন, সবুজ পরিবেশবান্ধব ঢাকা, নিরাপদ স্বাস্থ্যকর ঢাকা, সচল ঢাকা, মানবিক ঢাকা, স্মার্ট ঢাকা এবং অংশগ্রহণমূলক সুশাসিত ঢাকা।

পরিচ্ছন্ন সবুজ পরিবেশবান্ধব ঢাকা
প্রতিশ্রুতির বাস্তববায়নের মধ্যে রয়েছে- বর্জ্যরে আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার করে বিদ্যুত-সার সম্পদ সৃষ্টি; প্রতি ওয়ার্ড, রাস্তা ও বাড়িভিত্তিক পরিকল্পিত বনায়ন; জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং লেক পার্ক মাঠ পরিস্কার ও উন্নয়ন করে বিনোদনকেন্দ্র রূপে গড়ে তোলা।

নিরাপদ স্বাস্থ্যকর ঢাকা
প্রতিশ্রুতির বাস্তববায়নের মধ্যে রয়েছে- ফরমালিনমুক্ত বাজার ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত; মাদক ও সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ; নারীসহ সকলের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক পাবলিক টয়লেট; নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের নারী পুরুষ ও বস্তিবাসী মানুষের সেবার আওতা বাড়ানো; সংক্রামক ব্যধির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, নিয়মিত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান; স্কুলে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচী এবং নগরীর জল জমি বায়ু শব্দ দূষন ও ধুলোবালি নিয়ন্ত্রনে পদক্ষেপ।

সচল ঢাকা
প্রতিশ্রুতির বাস্তববায়নের মধ্যে রয়েছে- গনপরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার, নারীর জন্য বিশেষ বাস; যথাস্থানে বাস স্টপেজ এবং রেল সেবা বাড়ানোর উদ্যোগ; মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপেসওয়ে বাস্তবায়নে তৎপরতা চালানো; সড়ক সংস্কার এবং ফুটপাতকে প্রশস্ত করে গাছ লাগানো, ছাউনিসমৃদ্ধ ও সবার ব্যবহার উপযোগী করা, পথচারীদের জন্য জ্রেবা ক্রসিং, পথচারী সংকেত, কমিউনিটি ট্রাফিক প্রচলন; প্রতিটি জোনে সুনির্দিষ্ট পার্কিং কাম কর্মাশিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং নগরের সাইকেল ব্যবহার উৎসাহিত করা ও যেখানে সম্ভব সাইকেল লেন করা।

মানবিক ঢাকা
প্রতিশ্রুতির বাস্তববায়নের মধ্যে রয়েছে- নগর হবে মানবিক ও নাগরিক মর্যাদার, গরীব-ধনী শ্রেণী ধর্ম নির্বিশেষ সবার; প্রতিটি ওয়ার্ডে ডে-কেয়ার সেন্টার কাম প্রি স্কুল নির্মাণ; প্রতিটি ওয়ার্ডে ছাত্রী ও কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল প্রতিষ্ঠা; কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির প্রণোদনা ও ব্যবস্থা; গার্মেন্টস, পরিবহনসহ অন্যান্য খাতের শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসনের ব্যবস্থা; সুসম্বনয়ের মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন; সিটি কর্পোরেশনে অনুদান তহবিল প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, এতিমখানা, অন্যান্য উপাসনালয় ও কমিউনিটির নানা উদ্যোগে অনুদান দেওয়া; ডিএসসিসির উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়, নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরী ও তথ্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা; ডিএসসিসির এলাকায় একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ স্থাপন, অন্যান্য ধর্মালম্বীদের উপাসনালয় নির্মাণে সহায়তা করা এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে কবরস্থান প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন।

স্মার্ট ঢাকা
প্রতিশ্রুতির বাস্তববায়নের মধ্যে রয়েছে- পিপিপি’র মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পাবলিক স্থানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু; ই-লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা; সিসিটিভির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ডিজিটাল বুলেটিন বোর্ড স্থাপন; নাগরিক সমস্যা জানানো, সেবা সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালু; নাগরিক সেবা, অভিযোগ ও সমস্যা সমাধানে ২৪ ঘন্টা হটলাইন চালু; কর্পোরেশনের সব ধরনের সেবাকে ডিজিটাল করা, ই-সেবা চালু করা; ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও বিনোদন চর্চার জন্য একটি সিভিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা; মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধি ও বয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য বিশেষ সেবা সম্বলিত সিটি কার্ড প্রচলন; শিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য একটি মিডিয়া সেন্টার নির্মাণ এবং তরুণদের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া কেন্দ্র নির্মাণ।

অংশগ্রহণমূলক সুশাসিত ঢাকা
প্রতিশ্রুতির বাস্তববায়নের মধ্যে রয়েছে- আইনি দূর্বলতা দূর করে সিটি কর্পোরেশনকে সেবা প্রদানে ও পরিকল্পনায় শক্তিশালী ও জনসম্পৃক্ত করা; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, ডিএনসিসির নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থা করা; ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সভা ও কেন্দ্রীয়ভাবে নগর সভা করা, নগর উন্নয়নে উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠন; নাগরিক তথ্য কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রতি বছর প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে দুইজনকে সুনাগরিককে সিটি চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড দেওয়া।

Developed by: