স্টাফ রিপোর্টার : ভয়ানক ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট। সিলেটের আশপাশে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূকম্প হলেই সিলেটে পরিণতি হবে ভয়াবহ। আর ভূমিকম্পের মাত্রা যদি হয় ৮, তবে জনশূন্য বিরাণ ভূমিতে পরিণত হবে সিলেট। ধসে পড়বে সিলেটের ২৪ হাজার ভবন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়ম ভেঙে যতোতত্র সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ফলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে সিলেট নগরী। এতে ক্ষয়ক্ষতি হবে বেশ কয়েক হাজার কোটি টাকার, প্রাণহানি ঘটবে লাখ লাখ মানুষের।
ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসার্টিয়াম ১৯৯৮-এর জরিপ অনুযায়ী, ‘সিলেট অঞ্চল’ ১০০ বছরের বেশী সময় ধরে সক্রিয় ভূ-কম্পন এলাকা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। ২০০৯ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, সিলেট অঞ্চলে ৫২ হাজার ভবন রয়েছে। তন্মধ্যে ২৪ হাজার ভবনই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। জরিপের তথ্য দেখে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বিল্ডিং কোড অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে সিডিএমপির জরিপে সিলেটে ভূকম্পের ঝুঁকিতে ২৪ হাজার ভবনের কথা উল্লেখ করা হলেও সিলেট সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত বিভাগের কাছে এ সম্পর্কিত সঠিক তথ্য নেই। ২০০৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, সিলেট মহানগরীতে শতাধিক প্রাচীন ভবন রয়েছে, যেগুলোর বয়স একশ থেকে দেড়শ বছর। এসব ভবন ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে রয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার কার্যালয়, কাস্টমস অফিস, জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, সিটি মার্কেট, সিলেট সাব পোস্ট অফিসের ফরেন রেমিটেন্স ভবন প্রভৃতি। এসব সরকারি ভবন ছাড়াও সিলেট মহানগরীতে এশিয়া মার্কেট, নেহার মার্কেট, সুরমা মার্কেট, মধুবন মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়, মিতালী মার্কেট, রহমান ম্যানশনসহ অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন সুউচ্চ ভবন ভূকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভবনের সিংহভাগই বিল্ডিং কোড মেনে হয়নি বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট মহানগরীর সর্বত্র অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে সুউচ্চ ভবন। এসব ভবন নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রেই সয়েল টেস্ট করা হয়নি, আবার সিসিকের কাছ থেকে ৫ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি নিয়ে ৮-১০ তলা নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া সিসিক থেকে একধরনের নকশার অনুমোদন নিয়ে অন্য নকশায় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে যেকোনো সময় ভূমিকম্পে এসব ভবনের ধসে পড়ার আশংকা রয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান জানান, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনগুলোর তালিকা তৈরীর কাজ শিগগিরই শুরু হবে। এছাড়া সিলেট নগরীকে নিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। এটি অনুমোদিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।’
ইতিহাস বলছে, ১৫৪৮ সালে প্রচন্ড ভূমিকম্পে সিলেট এলাকায় ব্যাপক ভূ-পরিবর্তন ঘটে। উঁচু-নিচু ভূমি সমতলে পরিণত হয়। এরপর ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৮১২ ও ১৮৬৯ সালের ভূমিকম্পে সিলেটের মানচিত্র অনেকটাই পাল্টে যায়। সিলেটে এ যাবৎকালের মধ্যে ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সংঘটিত ভূমিকম্প ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থ কোয়াক’ নামে পরিচিত। ৮ দশমিক ৭ মাত্রার সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ বর্গ কি.মি. এলাকার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। শুধু সিলেট জেলারই ৫৪৫টি ভবন ভেঙে পড়ে। মারা যান অসংখ্য মানুষ। ওই ভূকম্পের ফলেই সিলেট জুড়ে সৃষ্টি হয় বিশালাকারের হাওর, বিল, জলাশয়ের। পরবর্তীতে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ১৯১৮ সালের ১৮ জুলায় ৭.৬ মাত্রার ভূকম্প সংঘটিত হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট মহানগরীর তালতলায় রয়েছে একমাত্র প্রথম শ্রেণীর ফায়ার স্টেশন। এছাড়া নগরীর আলমপুরে দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি ফায়ার স্টেশন রয়েছে। এ মহানগরীর মতো অতিদ্রæত বর্ধিষ্ণু নগরীতে অন্তত ৫টি ফায়ার স্টেশন থাকা উচিত বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সিলেট’র সহকারি পরিচালক মো. শহিদুর রহমান বলেন, ‘দুর্যোগকালে উদ্ধার কিংবা অনুসন্ধানের জন্য আমাদের কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সিলেটে বহুতল ভবনগুলো গড়ে ওঠছে ঝুঁকিপূর্ণভাবে। ফায়ার সার্ভিসের নীতিমালা না মেনে গড়ে ওঠা ভবনগুলোতে ধস বা অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ভিাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ‘সন্দেহাতীতভাবে সিলেট ভয়ানক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু ভূকম্প হলে এখানে উদ্ধার তৎপরতা কিংবা বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার মতো সরঞ্জাম নেই, আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। ফলে দুর্যোগ ঘটলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।’
বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, সিলেট অঞ্চল যে টেকনোটিক প্লেটে রয়েছে, তা ক্রমেই উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। এক শতাব্দিতে তা এক মিটার করে সরছে। এ কারণে এ অঞ্চল প্রবল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে ৩টি ভূকম্প বলয়ের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তথা প্রথম বলয়েই রয়েছে সিলেট। এ বলয়ে ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূকম্প হতে পারে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় প্রতি ১শ বছর পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটতে পারে। সিলেটে ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়ংকর ভূমিকম্পের পর পেরিয়ে গেছে ১শ বছরের বেশি। যে কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের আরেকটি ভূমিকম্পের আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শাবির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আখতারুল ইসলামের মতে, ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সিলেটে ষাট থেকে একশ বছরের পুরনো ভবনগুলো ধসে পড়বে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ভিাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ‘ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ডাউকি থেকে মাত্রা ২শ কিলোমিটার দূরে রয়েছে সিলেট। ডাউকি পয়েন্টে যদি ৬ মাত্রার ভূকম্পও হয়, তবে পরিণতি হবে ভয়াবহ। আর যদি ৭.৯ মাত্রার ভূকম্প হয়, তবে সিলেট নগরী বলে কিছুই থাকবে না। ১০-১৫ হাজার ভবন নিমিষেই মাটির সাথে মিশে যাবে।’

