যাবতীয় ক্লান্তরি পালক
ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িগুলো বাড়ি ছিল
মায়ের মমতার মত তারা আমাদের আগলে রাখত
বাড়িগুলোর মাটির মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে
আমরা চলে যেতাম স্বপ্নরাজ্যে, যেখানে
রাজার কুমারী কন্যা সিথানে দাড়িয়ে পালকের
পাখায় তাড়িয়ে দিতো আমাদের যাবতীয় ক্লান্তি
বাড়ির টিনের ছাদে বর্ষার অবিরাম গান
আমাদের সপ্তসুরে বাধতে চাইলে, মাজা পুকুরের
ব্যাঙ পাঠাত স্নানের নিমন্ত্রণ, আমরা নেমে যেতাম
অনন্তকালের স্নানে। পুকুরের জল ছুঁয়ে বেড়ে
উঠা নেবু-গাছগুলো তাদের নির্লজ্জতা দেখিয়ে
লোভ জাগাত, শরীরে খিধে জেগে উঠলে
অসমাপ্ত স্নান শেষে ফিরতাম, চাটাইয়ে
সাজানো মাটির সানকিতে আমাদের মায়েরা
ঢেলে দিতো বকুল ফুলের মত ধবধবে সাদা ভাত
শর্ষে ইলিশ আর কাঁচা লঙ্কায় পূর্ণ উদরে আমরা
ছেলেবেলার বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতাম।
বাড়ির লেপা উঠানে ক্রমাগত পায়ের ছাপ
এঁকে এঁকে আমরা বড় হয়ে উঠলে দেখতাম
বাড়িগুলো আর বাড়ি নয় তারা হয়ে উঠেছে
ইট, কাঠ, কংক্রিটের তথাকথিত বাসা-
কৃত্রিম ঝর্ণা কিংবা বাথটাবের জলে আমাদের
ছেলেবেলার বাড়ি গুমরে মরে, ক্লান্ত দেহ
মেঝেতে আশ্রয়ের খোঁজে লুটিয়ে পড়লে
সারা শরীরে অনুভূত হয় অযাচিত ইটের ধর্ষণ।
ভেজা সন্ধ্যা
হাতে হাত রেখে
দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে
হাটার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে
দূরের সংগীত
ধীরে ধীরে বোধগম্য হতে থাকে
বাতাসের ধাক্কায় শিরিষ পাতাগুলো
তিরতির কাঁপতে থাকলে
আমি ভাবি
কাটানো যাবে
একটা লঘুকরণ সন্ধ্যা
শেষ স্টপের এখনও ঢের বাকি
সূর্য তার গেরুয়া বসন সদ্য খুলেছে
ফুলের পাপড়িরা খুলেছে
নির্ভাবনার খোঁপা
সন্ধ্যার প্রাক্কালে হঠাৎ বিস্ময়াবিষ্ট বৃষ্টি
তুমি বললে- এসো ভিজি
বললাম- আমি সিক্ত হয়েই আছি
অন্য মানুষ
নগ্ন পায়ে পায়চারী করতে থাকলে
ক্যাফিনের ফ্লেভার গুলো মস্তিষ্কে
ছড়িয়ে পড়তে পারে ভেবে থামি
ওপাশের পাপোষে পা দুটি একটু
রগড়িয়ে পুনরায় পায়চারী শুরু করব
কি না দ্বিধান্বিত হলে মনো অন্দরে
তোলপাড় শুরু হয়, ভয়াবহ ঘটনার
প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবী কি দুলে উঠলো?
ঘরের বিছানায় যে নিষ্প্রাণ শরীর
তার সাথে কি কেটেছিল কিছু অনবদ্য সময়?
ইতিমধ্যে যা ঘটার ঘটেছে, ঘড়ির কাটায়
সময় পেরুচ্ছে সময়ের ঘাট, আমিও আটঘাট
বেঁধে ভোরের প্রতীক্ষায় হাতে নেই কফির পেয়ালা
তিনের পরে চতুর্থ পর্বে মস্তিষ্কে যদি
ক্যাফিন ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি কি
ভাবিত ক্ষণ পেরিয়ে ভোর হবে
প্রভাত আলোয় উন্মোচিত হবে
মানুষের অন্য রূপ, কত অবলীলায়
মুছে ফেলা যায় প্রাণ, ঝেড়ে ফেলা যায়
জগত সংসারের মায়া, আজ ভোরে
প্রমাণিত হবে মানুষের ভিতরে থাকে
অন্য মানুষ, হন্তারক মানুষ
প্রাণ সংহারের পরেও মেতে
উঠতে পারে ক্যাফিন বিলাসিতায়
সুন্দরবনের জন্য এলিজি
বিদ্যুতে পারদর্শী কিংবা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ
আমাদের কাঙ্ক্ষায় থাকুক, বৈরিতায়
পথ পাড়ি দিতে হবে এমন আত্মঘাতী
পরিকল্পনা স্থগিত করে পাখিদের নিঃশ্বাস
নিশ্চিত জরুরী, গাছেদের পাতায় সবুজ
রঙের অবিরাম সরবরাহ আছে জানিয়ে
ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে পৌঁছাতে হবে
চিত্রল হরিণ, চিত্রা তীব্র গতিতে
পেরিয়ে যাচ্ছে সুন্দরী বৃক্ষ, এমন দৃশ্য
ভেবে আমাদের উৎকণ্ঠিত মন তড়পাক
নিজেদের আশ্বস্ত করতে পারব ধারাবাহিকতা
রক্ষা হচ্ছে, মন ও মননে প্রকৃতি থাকুক
তার সহযোগী হয়ে পৌঁছাই সবুজাভ সময়ে
প্রকৃতির পথে হাঁটলেই নিশ্চিত হবে সূর্যের
সুষম বণ্টন, অযাচিত তাপে এবং চাপে
বিপর্যস্ত হয় মানুষ ও প্রকৃতির প্রাণ
সত্য সভ্যতার জন্য সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে…
গল্পের শেষাংশ
পূর্বপুরুষের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করতে করতে
আমরা পৌঁছি প্রখর সূর্যের দেশে
খনন কার্যের প্রারম্ভেই পেয়ে যাই
একটা পতাকার অবশিষ্টাংশ
স্বপ্ন গল্পের শেষাংশ
দেখব বলে খনন জারী রাখি
তর্জনী হেলানোর দাপট
তাদের আত্মাকে পুনর্জীবিত করে
আমরা দেখি আদিম খোলস ছেড়ে
তারা বুনে যাচ্ছে মানুষের মাঠ
পাখিদের সংসারে লিখছেন
পালকের পতন কথা
ঘাসের বিছানায় শুয়ে
অনাগত ভবিষ্যৎ ভাবছেন
ঠেকিয়ে রাখছেন পতন্মুখ আকাশকে
প্রতিদিন ভোরে মানুষ সূর্য পাবে
নিশ্চিত হলে তারা ডুব দেন
পদ্মা মেঘনা সুরমার জলে
আমাদের আমোদ কালে
তারা কিছুটা বিস্মৃত হন
এই সুযোগে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী
স্মৃতি ফলকে চালায় বিভ্রান্তির হাতুড়ি
মিথ্যার ব্যবসায়ী এসব ঘাতক
সফল হয়েছে ভেবে আত্মতৃপ্তির
ঢেঁকুর তুলে
আমোদ পর্ব শেষে আমরাও জেগে উঠি
পূর্বপুরুষের সূর্য করায়ত্ত বিদ্যায়
আমরাও কম পারদর্শী নই
প্রমাণিত হলে দুষ্কৃতিকারীরা
চালায় মরণ কামড়
আমরা জেনে যাই
দড়ি এবং খোয়ারের অনিবার্যতা
কর্মপন্থা স্থির করে
এগিয়ে যাই
পূর্বপুরুষের পতাকা
পুনরায় প্রতিস্থাপিত হবেই…