রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প কি সুন্দরবন এর মৃত্যু ডেকে আনবে ? অনেকটা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে আন্দোলনকারীপক্ষ ও সরকার !

coal-fired-power-plant-700x400

বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। এ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে ছয় বছর ধরে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে এ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। তবে গত মাসে কেন্দ্র নির্মাণের চূড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার পর জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকটা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে আন্দোলনকারীপক্ষ ও সরকার। যদিও শেষ পর্যন্ত সরকার কিছুটা নমনীয় হয়ে রামপালে একটির বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা এতেও সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি, সুন্দরবনের পাশে সব ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

এদিকে রামপালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্তে সরকার অটল। এর পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে সরকার ও প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। পাল্টা যুক্তি হাজির করছেন আন্দোলনকারী ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তাঁদের দাবি, ওই প্রকল্প সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হবে না বলে প্রমাণ করার লক্ষ্যে যে ব প্রযুক্তির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্গত বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ কমাতে পারবে না। এ ছাড়া ওই ব প্রযুক্তি আদৌ ব্যবহার করা হবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী বলছেন, শহর এলাকায় বাতাসে এক ঘনমিটার জায়গায় ধূলিকণার সহনীয় মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। রামপাল এলাকায়ও এ মান ৫০ মাইক্রোগ্রাম দেখিয়ে এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) বা পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ করা হয়েছে। অথচ সুন্দরবন এলাকায় বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা ১৮ মাইক্রোগ্রাম। অন্যদিকে রামপালে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে—এমন খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ জায়গা কিনতে থাকে সুন্দরবনের ভেতরে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার আশায় আরো অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সুন্দরবনের ভেতর জায়গা কিনে কারখানা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে সুন্দরবনের বিপদ আরো বাড়ছে।

আগে সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল রামপালে একই ক্ষমতার (১৩২০ মেগাওয়াট) দুটি ইউনিট স্থাপন করার। গত মাসে বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশি করা হবে না। দুই দেশের সচিব পর্যায়ের এ বৈঠকের পর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শুধু রামপালের দ্বিতীয় ইউনিটই নয়, সুন্দরবনের পাশে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে না। সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এরই মধ্যে তেল-গ্যাস জাতীয় কমিটি রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আগামী ২০ আগস্ট এ কর্মসূচিতে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি জানাবে বলে মনে করছেন আয়োজকরা। রামপালে একটি প্রকল্প ছাড়াও মংলার বুড়িডাঙ্গা ইউনিয়নে বেসরকারি উদ্যোগে আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ৫৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বানাবে ওরিয়ন। প্রকল্প এলাকাটি সুন্দরবনের আরো কাছে। রামপাল প্রকল্প থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। আর ইউনেসকো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের দূরত্ব ৬৯ কিলোমিটার। ইউনেসকো এরই মধ্যে কয়েক দফা চিঠি দিয়ে এবং প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সরকারকে। অর্থমন্ত্রীরও মত, সুন্দরবনের ক্ষতি হবে : গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক পলা ক্যাবালেরোর নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই কিছু প্রভাব পড়বে। কয়লা নিয়ে এত নৌকা আসবে, এই নৌকা আসার ফলেই তো জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে।’ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরিয়ে অন্য কোথাও করা যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটার মনে হয় এখন পসিবিলিটি নেই।’ তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সাফ কথা, এ কেন্দ্র নির্মাণে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। আন্দোলনকারীরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব সুন্দরবনকে যাতে ক্ষতি না করতে পারে সে জন্য আমরা আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করব।’ তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘যদি একটি ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হয়, সেখানকার বাঘের আবাস ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ঢাকার চিড়িয়াখানায় বাঘ থাকত না। ঢাকার চারপাশে ৪৫০টি কয়লাভিত্তিক ইটভাটা রয়েছে। এগুলো থেকে যে পরিমাণ সালফার, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজনসহ ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয় তা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে ক্ষতিকর গ্যাস বের হবে তার ১০০ গুণ বেশি। কিন্তু এই ৪৫০টি ইটভাটার কারণে কিন্তু মিরপুর চিড়িয়াখানার বাঘ মরে যাচ্ছে না। তাহলে কিভাবে রামপাল থেকে এত দূরের সুন্দরবন ধ্বংস হবে?’

১০ প্রশ্নের সরকারি জবাব ও পাল্টা যুক্তি : রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় উত্থাপিত ১০টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নাইট্রোজেন অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সিলেক্টিভ ক্যাটালিস্ট রিঅ্যাক্টর (এসসিআর) ও সালফার অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে ফুয়েল-গ্যাস ডিসালফারাইজেশন (এফজিডি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না? পার্টিকুলেট ম্যাটার্সের মাত্রা কমাতে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিট্যাটর (ইএসপি) ও পারদ দূরীকরণের জন্য কী প্রযুক্তি নেওয়া হয়েছে? বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি পরিশোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষিত তরল নির্গমণ কমানো হবে কি না? বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পোড়ানো ছাই শুকনো অবস্থায় ফেলার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না? প্রকল্পে কার্যকর অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে কি না? প্রকল্প এলাকার পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর তাপীয় প্রভাব কমানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না? প্রকল্পে কয়লা আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেশের ওপর প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা থাকবে কি না এবং পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে তার ফলাফল জনগণের সামনে হাজির করা হয়েছে কি না? এই ১০টি প্রশ্নের জবাবে দুই দেশের যৌথ মালিকানাধীন রামপাল কেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কম্পানি লিমিটেডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাইট্রোজেন অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে এসসিআর ও সালফার অক্সাইড নিঃসরণ কম রাখতে এফজিডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। পার্টিকুলেট ম্যাটার্সের মাত্রা কমাতে ইএসপি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া পারদ দূরীকরণ ও পানি পরিশোধনের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। শুকনো ছাই ধরা হবে, থাকবে সার্বক্ষণিক অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা এবং পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর তাপীয় প্রভাব কমানোর আধুনিক ব্যবস্থা থাকবে। কয়লা আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে তার ফলাফল জনগণের সামনে হাজির করা হয়েছিল।

তবে আন্দোলনকারী ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এসব যুক্তির সঙ্গে একমত নন। এ প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, এই কেন্দ্রের জন্য যে ইআইএ করা হয়েছে সেখানে কিন্তু এই কথিত ১০টি পয়েন্টের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। আর এসব প্রযুক্তি আদৌ তারা ব্যবহার করছে কি না তা দেখারও কেউ নেই। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে অনেক অর্থ ব্যয় হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হবে। তিনি বলেন, এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না এটি নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। কারণ সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম একদমই অনন্য। ড. আবদুল্লাহ হারুন বলেন, শহর এলাকায় বাতাসে এক ঘনমিটার জায়গায় ধূলিকণার সহনীয় মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। রামপাল এলাকায়ও এ মান ৫০ মাইক্রোগ্রাম দেখিয়ে ইআইএ করা হয়েছে। অথচ সুন্দরবন এলাকায় বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা ১৮ মাইক্রোগ্রাম রয়েছে। সুন্দরবনকে বিদ্যুৎ বিভাগ শহরাঞ্চল হিসেবে দেখিয়েছে। এটি নিন্দনীয়। যখন রামপাল কেন্দ্র থেকে দৈনিক ৮৪.৬ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড বাতাসে মিশবে তখন বাতাসে নাইট্রোজেন অক্সাইডের ঘনত্ব দাঁড়াবে ৪৭.২ মাইক্রোগ্রাম। এটি সুন্দরবনের গোটা ইকো সিস্টেম ভেঙে দেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরের দিন থেকেই সুন্দরবন মরে যাবে না। এটি সময় নেবে। ধীরে ধীরে এর প্রাণবৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু আজ যাঁরা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তখন আর তাঁদের কাউকে পাওয়া যাবে না। সুন্দরবনের ভেতর গড়ে উঠছে শিল্পকারখানা : তিন পাশে সুন্দরবন, এক পাশে পশুর নদী, নদী পার হলেও সুন্দরবনে বন বিভাগের জোংরা অফিস—এ রকম একটি পরিবেশ স্পর্শকাতর এলাকায় ৩০০ একর জমি বালি ফেলে ভরাট করেছে সান ম্যারিন শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাগেরহাটের মংলার জয়মানি এলাকায় এই ভরাটকাজ করা হয়েছে। ওখান থেকে সুন্দরবনের চাঁদপাই বন বিভাগের অফিস ও নন্দবালা অফিস ভরাট করা জমির সঙ্গে লাগোয়া। পরিবেশ বিধ্বংসী শিপ ব্রেকিংয়ের একটি কারখানা নির্মাণ করার জন্যই এ জমি ভরাট করা হয়েছে। এ ছাড়া বনের ভেতর জমি কিনেছে সাউথ বাংলা সি ফুড, লিথি গ্রুপসহ অন্তত ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে এমন খবরের পর থেকে এ অঞ্চলে জায়গার দাম বেড়ে যায়। একের পর এক শিল্প গ্রুপ জায়গা কিনতে থাকে সুন্দরবনের ভেতরে। সুন্দরবনের ভেতর আরো অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান জায়গা কিনে কারখানা করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

Developed by: