রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবসের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, ৪০ বছর আগে যে দিনটিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শনিবার সকালে ঢাকার ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দেন রাষ্ট্রপ্রধান মো. আবদুল হামিদ ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।
সকাল ৬টার পর বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে পৌঁছলে তাকে অভ্যর্থনা জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা হাসিনা। এরপর দুজনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
ফুল দেওয়ার পর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা, এসময় বিউগলে বাজে করুণ সুর। এরপর তারা মোনাজাতও করেন সেখানে।
এরপর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা জানানোর পর দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
ফুল দেওয়া হয় মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে ১৪ দল এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনী প্রধানরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু জাদুঘর থেকে বোন রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে বনানী কবরস্থানে যান শেখ হাসিনা। সেখানে মা, ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরে ফুল দেন তারা, করেন মোনাজাত।
১৯৭৫ সালে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাইকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল বনানী কবরস্থানে। বঙ্গবন্ধুর সমাধি হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় পৈত্রিক এলাকায়। বিদেশে থাকায় তখন বেঁচে গিয়েছিলেন দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা পরে যান গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায়। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফুল দেওয়ার পর মিলাদেও অংশ নেন তারা।
স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যার পর বাংলাদেশ চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টোদিকে, স্বাধীনতার ইতিহাস হয় বিকৃত, নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে পুনর্বাসিত হয় স্বাধীনতাবিরোধীরা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয় ব্যাহত।
১৫ অগাস্টের বাণীতে শেখ হাসিনা বলেছেন, “যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু যখন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত, তখনই স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী চক্র জাতির পিতাকে হত্যা করে।
“এর মধ্য দিয়ে তারা বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করার অপপ্রয়াস চালায়। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে ফেলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।”
১৫ অগাস্টের বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, “শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা করা নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে ফেলা এবং পরাজিত শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য।”
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে পুনরায় ফেরেন বঙ্গবন্ধু।
এখন ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবস। সরকারি ছুটির এই দিনে নানা কর্মসূচিতে জাতির জনককে স্মরণ করছে দেশবাসী।
সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসেও এদিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। দূতাবাসগুলোতে থাকছে আলোচনা সভার আয়োজন।
শনিবার সূর্যোদয়ের সময় থেকে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ আওয়ামী লীগের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে, উড়ানো হয়েছে শোকের কালো পতাকা।
৪০ বছর আগে সেই রাতে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু ছাড়াও স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরকে হত্যা করে।
সেই রাতেই নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু; বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টু।
ধানমণ্ডির বাড়িতে পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমান এবং বঙ্গবন্ধু ভবনের অদূরে বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলকেও গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
শনিবার বনানী কবরস্থানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিয়া মো. জয়নুল আবেদীন কর্নেল জামিলের কবরে ফুল দেন।

