বাংলাদেশি খদ্দেরে ভারতের জাল পাসপোর্টের ব্যবসা রমরমা

বাংলাদেশি খদ্দেরে ভারতের জাল পাসপোর্টের ব্যবসা রমরমা। সেখানের ভিসা অফিসের ‘রিজেক্ট স্ট্যাম্প’ লাগানো বৈধ পাসপোর্ট নানা কারসাজিতে বদলে চলছে এই জাল পাসপোর্টের ব্যবসা। আর এর বিনিময়ে বহু টাকা নেওয়া হয় বাংলাদেশিদের কাছ থেকে।খবর আনন্দবাজার পত্রিকার।

খবরে বলা হয়, সম্প্রতি পেট্রাপোল সীমান্তে নো ম্যানস ল্যান্ডে একটি বাংলাদেশি ট্রাক আটক করা হয়। ওই ট্রাকের চালক সওকত আলি গাজি ও খালাসি মহম্মদ আবুল কালামকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বাড়ি বাংলাদেশের সারসা ও ঝিনাইদহে। তাদের কাছ থেকে সাতটি জাল ভারতীয় পোসপোর্ট উদ্ধার করে বিএসএফ। ওই জাল পাসপোর্টে ভিসা ছিল তানজানিয়া ও সৌদি আরবের। পাসপোর্টে থাকা নাম ও ঠিকানা ছিল বিহার ও উত্তরপ্রদেশের।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে খবরে বলা হয়, পাসপোর্টের এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। চক্রের সদস্যেরা দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকে তাদের পাসপোর্ট কিনে নেয়। এক একটি পাসপোর্ট ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে কেনা হয়। তারপরে পাসপোর্টে থাকা প্রকৃত ব্যক্তির ছবি তুলে বাংলাদেশি কারও ছবি সেখানে লাগানো হয়। ওই ছবি তুলে বাংলাদেশি ব্যক্তির ছবি লাগাতে খরচ পড়ে হাজার দশেক টাকা। ছবি পরিবর্তন করে এক একটি পাসপোর্ট বাংলাদেশি বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি হয় ৭০ হাজার টাকায়।

অতিসম্প্রতি পেট্রাপোল থেকে ধরা পড়া বাংলাদেশি যুবক চিকো বরুয়াকে জেরা করে আরও নানা তথ্য এসেছে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের হাতে। ধৃত ব্যক্তি জাল ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি চক্রেরই একজন বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বাসিন্দা বছর উনচল্লিশের চিকো ২৩ জানুয়ারি বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পেট্রাপোলে ঢোকে। ওই সময়ে অভিবাসন দফতরের কর্তারা তাকে আটক করেন। তাদের কাছে এ ব্যাপারে আগাম খবর ছিল। চিকোকে পরদিন বনগাঁ থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। আদালত থেকে দু’দফায় ১০ দিন পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয় চিকোকে। পুলিশের পাশাপাশি ডিআইবি ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারাও জেরা করেন চিকোকে। তারও আগে বাগুইআটি থেকে হাফিজ নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। জাল পাসপোর্ট চক্রের সঙ্গে জড়িত ওই ব্যক্তিকে জেরা করেই চিকো পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল পুলিশ।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, দিল্লি, চেন্নাই, উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব-সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চক্রটির জাল বিস্তৃত। সব জায়গায় তাদের এজেন্ট আছে। ইউরোপের দেশগুলিতে যাওয়ার জন্য যে সব ভারতীয় দিল্লিতে সংশ্লি‌ষ্ট দেশগুলির দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদন করেও ব্যর্থ হন, তারাই হল জাল পাসপোর্ট চক্রের মূলধন। ভিসা দেওয়া না হলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে পাসপোর্টের উপরে ‘রিজেক্ট’ (বাতিল) স্ট্যাম্প মেরে দেওয়া হয়। জাল ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরির চক্রের সদস্যেরা ওই সব পাসপোর্ট সংগ্রহ করে। ওই পাসপোর্ট সংগ্রহ করার জন্য আলাদা একটি চক্র দিল্লিতে খুবই সক্রিয়।

এক গোয়েন্দা কর্তার ভাষ্য, ‘বিশেষ ধরনের কালির সাহায্যে ইউরোপিয়ান দেশগুলির দূতাবাস থেকে পাসপোর্টের উপরে ‘রিজেক্ট’ স্ট্যাম্পটি তুলে দেওয়া হয়। তারপরে আসে ছবি বদলের প্রসঙ্গ। বিশেষ কায়দায় প্রথম পাতায় সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট মালিকের ছবি বদলে সেখানে কোনও বাংলাদেশির ছবি লাগিয়ে তার হাতে মোটা টাকার বিনিময়ে তুলে দেওয়া হয় সেই পাসপোর্ট। সব মিলিয়ে লাখ তিনেক টাকা খরচ করলেই সেই বাংলাদেশিকে জাল ভারতীয় পাসপোর্ট দিয়ে বিদেশে পৌঁছে দেওয়া হয়।’

কেন ওই পাসপোর্ট এত টাকার বিনিময়ে কেনেন বাংলাদেশিরা? গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, আরব দেশগুলিতে বাংলাদেশিদের শ্রমিক হিসাবে তেমন চাহিদা নেই। বরং সেখানে ভারতীয় শ্রমিকদের চাহিদা বেশি। তাই বাংলাদেশিরা ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে ভারতীয় সেজে সেখানে শ্রমিকের কাজে বা অন্য কোনও কাজে যায়। তা ছাড়া, বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট, ভিসা যাতায়াত মিলিয়ে আরবে যেতে মাথা-পিছু খরচ পড়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। কিন্তু ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে আরবের দেশগুলিতে যেতে খরচ পড়ে মেরেকেটে সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার মতো। সে কারণেই ভারতীয় পাসপোর্টের চাহিদা বাড়ছে বাংলাদেশিদের কাছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, কিছু দিন আগে এক বাংলাদেশি ডিআইবি’র হাতে গ্রেফতার হয় বারাসাতে। তার কাছ থেকে বেশ কিছু জাল ভারতীয় পাসপোর্ট ও লক্ষাধিক ভারতীয় টাকা উদ্ধার হয়। দিন কয়েক আগে মহম্মদ নজরুল ইসলাম নামে বাংলাদেশের মাঝেরহাটের বাসিন্দা এক যুবকও অভিবাসন দফতরের হাতে ধরা পড়েছে পেট্রাপোলে। সে-ও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

কিন্তু যে ভারতীয় নাগরিকের পাসপোর্ট কিনে নিল জাল পাসপোর্ট ব্যবসায়ীরা, তারা কী করে? ভবিষ্যতে তারা আবার পাসপোর্ট পায় কী করে? গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, পাসপোর্ট হারিয়ে গিয়েছে বলে এদের থানায় ডায়েরি করতে বলা হয়। ফলে আইনগত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। পাসপোর্টগুলি তারা বিক্রি করে ফের নতুন পাসপোর্ট তৈরি করেন।

কিছু দিন আগে এয়ারপোর্ট থানার পুলিশ কিছু পাসপোর্ট উদ্ধার করেছিল। তাতে নাম ছিল বাগদার কয়েকজন বাসিন্দার। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, তারা পাসপোর্ট হারিয়ে গিয়েছে বলে আগেই থানায় ডায়েরি করেছেন। ফলে কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

Developed by: