বিভাগ: সাহিত্য-সংস্কৃতি

আবদুল হাসিব-এর একগুচ্ছ কবিতা

hasib bhai

 

 

 

 

 

 

মূর্ত অভিসার

তুমি হাঁটছো কী না জানি না

বিশ্বাসের উর্বর মাঠে দাঁড়িয়ে

আমি দেখছি তুমি হাঁটছো

শেফালি ঝরা ধূলিপথ চল-চঞ্চল পদচালন

হাসনুহানার বিমুগ্ধ গন্ধ বিভোর চারিধার

পূর্ণেন্দুর মিষ্টি আলো তারাদের হাতছানি

অভিসার অনুরাগী তুমি

ফুরায়না পথ কাটেনা প্রহর কামুক অস্থির মন

তৃষাতুর অঙ্গুলী স্পর্শ প্রত্যাশা প্রতিক্ষায় থাকা;

আঃ হাঃ! এখনও কী যে অক্ষত; জীবন্ত অন্তর্গত।

 

বিশ্বাসের বেহায়াপনায় আমি পরাজিত

আমি বিনিদ্র রাত্রি জেগে দেখছি, কেবল দেখছি

তোমার সুঢৌল উর্ধমুখী বুকের কম্পন

কসে কসে পড়া কাঁচুলির মগ্ন সঞ্চালন

তুমি এখনো কুঞ্জপানে হাঁটছো

দ্রুত পদব্রজে অক্লান্ত তুমি হাঁটছো

জ্যোৎস্না-শিশিরে স্নাত হতে হতে

শরীরে তুমি প্রষ্পরেণু মাখছো।

 

কামিনী তোমার এমন কুস্তুরী গ্রাণ

অধীর অস্থির করেছে তনু-মন-প্রাণ

নগ্ন শরীরে মাধকানন্দে তুমি কামধেণু

আমি দেখছি তুমি বিভোর কামনাকাতুর

তুমি দু’হাতে কুচভরে ঝরা ফুল তুলছো

আমি নিরন্তর ঘ্রাণ নিচ্ছি;

আমার হৃদয়ের অস্থিত্ব ভরে ঘ্রাণ নিচ্ছি

তোমার নগ্ন দেহের ভুবনমোহিনী ভাজে ভাজে

যে বিমুগ্ধ গন্ধ আমার কামুক হৃদয় অস্থির করে তুলতো

সেই তৃষাতুর ঘ্রাণ হৃদয় পরতে আজো জীবন্ত অম্লান।

 

তুমি চিরটাকাল রাত্রির দিকে ধাবমান

প্রতিক্ষার প্রভাত আমার জন্যে নিয়ে আসে

ক্লেশ-ক্লান্তি-গ্লানি আর যতো অপমাণ! প্রেয়সী আমার

আমি তোমাকে দেখছি, দেখবো অনন্তকাল।

কী ভাবে পারে ওরা

কী ভাবে সম্ভবপর

ধর্ম-কর্ম সমাজ সংসার

অত:পর লিখে যায় কবি

দু:খ সুখের বিচিত্র সমাচার।

 

তার বুকের ভেতর থাকে সাহসের ঘর

কবির থাকে না তাই ভয়-ভীতি-ডর

আঙিনায় ছড়ানো থাকে সহস্র সাধ

মিটিবার প্রত্যাশায় প্রচেষ্টা অগাধ

কবির থাকে প্রেমাসিক্ত দু’খানা বাহু

স্পর্শ করে না তারে নির্মম রাহু

খুলা প্রাণে গায় গান কারণ-অকারণ

হৃদি যমুনায় চলে মগ্ন সন্তরণ।

 

কতো জনের প্রার্থনা কতো ভাবে সুর সাধা

সে কি আর শুনে বাধা

হৃদয় কাননে যার

রাশলীলা রাধা।

 

ষোল শো গোপিনী ভুলায় মগ্নলীলায়

কবি জ্বলে, কবি জ্বালিয়ে ভুলায়

কবি ভাবে কবি লিখে, কবি ভাবায় লিখায়

কবি শক্তি দেয় শক্তি পায়;

যতো ক্লান্তি দু:খ ক্লেশ গ্নানি

সকলই ভাসায় কবি প্রেম যমুনায়।

 

কবি বিশ্রাম বিলাসে বসে

কল্লোলিনী তীরে

মহুয়ার নীল অরণ্যে ঘিরে

প্রশান্তির বাতাস বয় খুব ধীরে ধীরে;

চেয়ে দেখে নিলীমায় উঠে মোটা চাঁদ

কবির কলমে কী আর মানে কোন বাঁধ।

বিরহিণীর শোকগাথা

মিথুন মৈথুনে মত্ত্ব হলে

অনায়াসে বিছানা বালিশ ঠিকানা হারায়

প্রসন্ন প্রশান্তি লাগে

ভোরের বিছানা যখন মুগ্ধ তৃপ্তির স্বাক্ষর ভাসায়।

 

কামুক নাগর কামাতুর হলে

আসক্ত কামিনী কামাগ্নি জ্বালায়

স্নানপাত্রের বদ্ধ জলের মাঝেও তখন

সামুদ্রিক তরঙ্গ উঠায়।

 

দূর থেকে ভাসে চোখে, শান্তি তার সারা বুকে

স্নানাগার ছেড়ে এসে মৃদু পায়ে হেঁটে হেঁটে

তৃপ্তা রমণী যখন রমণের রেশটুকু পান করে সুখে;

আমার দু’চোখ ভরে শ্রাবণের বরিষণ ঝরে বড় দুঃখে।

 

আমার হয়নি বুঝা বিছানার ভাষা

আমার জলাশয় তীরে লাগেনি কোন ঢেউ

আমার মিঠেনি আজো কামনার আশা

আমার আরতি গুলো গ্রহণ করেনি কেউ।

 

আমার জীবন যৌবন তবে কি বরফ জমাট জলাশয়;

আমার বুকের ভাষা কি তবে কঠিন নিরব হিমালয়!

আমি আসবো ফিরে

বর্ণালী আকাশের নীচে নদীর তীরে

বসে আমি আছি একা, হয়ত বা কাল

চোখের হবে না দেখা প্রসন্ন সকাল,

মুছে যাবে সব রঙ অন্ধকারে ধীরে।

এই পথে এই মাঠে এই নদী ঘাটে

যখন আর আসবো না হে রূপরাণী

করুণ নিঃশ্বাস কোন ফেলবে না জানি

তবুও সাধ হবে আসতে এই নাটে।

 

বারে বারে তোমার রূপ উঠবে ফুটে,

নীলাকাশ ফুল ভ্রমর নদীর পানি

ভরে থাকবে হৃদয়ের প্রচ্ছদ খানি

গোধূলির আবিরে আমি আসবো গুটে।

পূর্ণিমা জ্যোছনায় আমি আসবো ফিরে,

শিশির চাদরে আমায় রাখবে ঘিরে।

কর্মরত থাকে

ঘুণপোকা ঢুকে গেলে কর্মরত থাকে

যতক্ষণ সড়ঙ্গ পথ শেষান্তে আসে

কেটে যেতে ততক্ষণ খুব ভালোবাসে,

বিষাক্ত দন্তের দ্বারা সে নকঁশা আঁকে।

ঘরের গৃহস্থ শুনে গুঞ্জন পোকার

ভয়ে কেঁপে উঠে বলে করি কী উপায়,

নিধন করতে পোকা ঔষধ লাগায়

পোকার হয় না কিছু, ঘরের বিকার।

 

দিনে দিনে কাঠামো ঘরের কসে পড়ে,

এক দিকে ঠেস দিলে অন্য দিকে নামে,

মড় মড় শব্দ করা কিছুতে না থামে,

একটু বাতাস এলে সারা ঘর নড়ে;

অবশেষে একদিন ঘর পড়ে যায়,

শোকাহত উত্তরসুরী অশ্রু ঝরায়!

আবু মকসুদ এর একগুচ্ছ কবিতা

muksud

 

 

 

 

 

 

যাবতীয় ক্লান্তরি পালক

ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িগুলো বাড়ি ছিল

মায়ের মমতার মত তারা আমাদের আগলে রাখত

বাড়িগুলোর মাটির মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে

আমরা চলে যেতাম স্বপ্নরাজ্যে, যেখানে

রাজার কুমারী কন্যা সিথানে দাড়িয়ে পালকের

পাখায় তাড়িয়ে দিতো আমাদের যাবতীয় ক্লান্তি

 

বাড়ির টিনের ছাদে বর্ষার অবিরাম গান

আমাদের সপ্তসুরে বাধতে চাইলে, মাজা পুকুরের

ব্যাঙ পাঠাত স্নানের নিমন্ত্রণ, আমরা নেমে যেতাম

অনন্তকালের স্নানে। পুকুরের জল ছুঁয়ে বেড়ে

উঠা নেবু-গাছগুলো তাদের নির্লজ্জতা দেখিয়ে

লোভ জাগাত, শরীরে খিধে জেগে উঠলে

অসমাপ্ত স্নান শেষে ফিরতাম, চাটাইয়ে

সাজানো মাটির সানকিতে আমাদের মায়েরা

ঢেলে দিতো বকুল ফুলের মত ধবধবে সাদা ভাত

শর্ষে ইলিশ আর কাঁচা লঙ্কায় পূর্ণ উদরে আমরা

ছেলেবেলার বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতাম।

 

বাড়ির লেপা উঠানে ক্রমাগত পায়ের ছাপ

এঁকে এঁকে আমরা বড় হয়ে উঠলে দেখতাম

বাড়িগুলো আর বাড়ি নয় তারা হয়ে উঠেছে

ইট, কাঠ, কংক্রিটের তথাকথিত বাসা-

কৃত্রিম ঝর্ণা কিংবা বাথটাবের জলে আমাদের

ছেলেবেলার বাড়ি গুমরে মরে, ক্লান্ত দেহ

মেঝেতে আশ্রয়ের খোঁজে লুটিয়ে পড়লে

সারা শরীরে অনুভূত হয় অযাচিত ইটের ধর্ষণ।

ভেজা সন্ধ্যা

হাতে হাত রেখে
দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে
হাটার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে

দূরের সংগীত
ধীরে ধীরে বোধগম্য হতে থাকে
বাতাসের ধাক্কায় শিরিষ পাতাগুলো
তিরতির কাঁপতে থাকলে
আমি ভাবি
কাটানো যাবে
একটা লঘুকরণ সন্ধ্যা

শেষ স্টপের এখনও ঢের বাকি
সূর্য তার গেরুয়া বসন সদ্য খুলেছে
ফুলের পাপড়িরা খুলেছে
নির্ভাবনার খোঁপা

সন্ধ্যার প্রাক্কালে হঠাৎ বিস্ময়াবিষ্ট বৃষ্টি
তুমি বললে- এসো ভিজি
বললাম- আমি সিক্ত হয়েই আছি

অন্য মানুষ

নগ্ন পায়ে পায়চারী করতে থাকলে
ক্যাফিনের ফ্লেভার গুলো মস্তিষ্কে
ছড়িয়ে পড়তে পারে ভেবে থামি
ওপাশের পাপোষে পা দুটি একটু
রগড়িয়ে পুনরায় পায়চারী শুরু করব
কি না দ্বিধান্বিত হলে মনো অন্দরে
তোলপাড় শুরু হয়, ভয়াবহ ঘটনার
প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবী কি দুলে উঠলো?
ঘরের বিছানায় যে নিষ্প্রাণ শরীর
তার সাথে কি কেটেছিল কিছু অনবদ্য সময়?

ইতিমধ্যে যা ঘটার ঘটেছে, ঘড়ির কাটায়
সময় পেরুচ্ছে সময়ের ঘাট, আমিও আটঘাট
বেঁধে ভোরের প্রতীক্ষায় হাতে নেই কফির পেয়ালা
তিনের পরে চতুর্থ পর্বে মস্তিষ্কে যদি
ক্যাফিন ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি কি
ভাবিত ক্ষণ পেরিয়ে ভোর হবে
প্রভাত আলোয় উন্মোচিত হবে
মানুষের অন্য রূপ, কত অবলীলায়
মুছে ফেলা যায় প্রাণ, ঝেড়ে ফেলা যায়
জগত সংসারের মায়া, আজ ভোরে
প্রমাণিত হবে মানুষের ভিতরে থাকে
অন্য মানুষ, হন্তারক মানুষ
প্রাণ সংহারের পরেও মেতে
উঠতে পারে ক্যাফিন বিলাসিতায়

সুন্দরবনের জন্য এলিজি

বিদ্যুতে পারদর্শী কিংবা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ
আমাদের কাঙ্ক্ষায় থাকুক, বৈরিতায়
পথ পাড়ি দিতে হবে এমন আত্মঘাতী
পরিকল্পনা স্থগিত করে পাখিদের নিঃশ্বাস
নিশ্চিত জরুরী, গাছেদের পাতায় সবুজ
রঙের অবিরাম সরবরাহ আছে জানিয়ে
ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে পৌঁছাতে হবে
চিত্রল হরিণ, চিত্রা তীব্র গতিতে
পেরিয়ে যাচ্ছে সুন্দরী বৃক্ষ, এমন দৃশ্য
ভেবে আমাদের উৎকণ্ঠিত মন তড়পাক
নিজেদের আশ্বস্ত করতে পারব ধারাবাহিকতা
রক্ষা হচ্ছে, মন ও মননে প্রকৃতি থাকুক
তার সহযোগী হয়ে পৌঁছাই সবুজাভ সময়ে

প্রকৃতির পথে হাঁটলেই নিশ্চিত হবে সূর্যের
সুষম বণ্টন, অযাচিত তাপে এবং চাপে
বিপর্যস্ত হয় মানুষ ও প্রকৃতির প্রাণ
সত্য সভ্যতার জন্য সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে…

গল্পের শেষাংশ

পূর্বপুরুষের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করতে করতে
আমরা পৌঁছি প্রখর সূর্যের দেশে
খনন কার্যের প্রারম্ভেই পেয়ে যাই
একটা পতাকার অবশিষ্টাংশ
স্বপ্ন গল্পের শেষাংশ
দেখব বলে খনন জারী রাখি
তর্জনী হেলানোর দাপট
তাদের আত্মাকে পুনর্জীবিত করে
আমরা দেখি আদিম খোলস ছেড়ে
তারা বুনে যাচ্ছে মানুষের মাঠ
পাখিদের সংসারে লিখছেন
পালকের পতন কথা
ঘাসের বিছানায় শুয়ে
অনাগত ভবিষ্যৎ ভাবছেন
ঠেকিয়ে রাখছেন পতন্মুখ আকাশকে
প্রতিদিন ভোরে মানুষ সূর্য পাবে
নিশ্চিত হলে তারা ডুব দেন
পদ্মা মেঘনা সুরমার জলে

আমাদের আমোদ কালে
তারা কিছুটা বিস্মৃত হন
এই সুযোগে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী
স্মৃতি ফলকে চালায় বিভ্রান্তির হাতুড়ি

মিথ্যার ব্যবসায়ী এসব ঘাতক
সফল হয়েছে ভেবে আত্মতৃপ্তির
ঢেঁকুর তুলে

আমোদ পর্ব শেষে আমরাও জেগে উঠি
পূর্বপুরুষের সূর্য করায়ত্ত বিদ্যায়
আমরাও কম পারদর্শী নই
প্রমাণিত হলে দুষ্কৃতিকারীরা
চালায় মরণ কামড়

আমরা জেনে যাই
দড়ি এবং খোয়ারের অনিবার্যতা
কর্মপন্থা স্থির করে
এগিয়ে যাই
পূর্বপুরুষের পতাকা
পুনরায় প্রতিস্থাপিত হবেই…

শামীম আহমদ’র তিনটি কবিতা

shamim

 

 

 

 

 

 

কামিনী
সনাতন পথ ধরে তুমি এলে ফিরে ,
নিকুঞ্জ কাননে-
তপোবন কেঁপে কেঁপে ওঠে, নূপুর ঝংকারে ।
মহা ঋষি মুখ তুলে চায় ,
ধ্যান ভেঙে বলে কে এলে অবেলায় ।

সে বলে ,আমি কামিনি গো স্বামী ,
জটাধর মৃদুহাস্যে বলেন,ও কামিনী তুমি ।
কি নিতে চাও আজ বল্,
নাগের মনি ,না কি হলাহল ;
যদি হলাহল চাও
এক্ষুণি নিতে পার,
না হয় নিজের পথ ধর ,
আর যদি মনি চাও
৩৬ বছর তপস্যায়
তপোবনে থেকে যাও ।

কথা শুনে কামিনী উঠিল চমকিয়া ,
তা তা থৈ থৈ ছন্দে নাচে তপোবন জুড়িয়া ,
পাতাল হতে উর্ধ্বাকাশে যেন বিজুলি তড়িৎ ,
ঋষির বনতল পুড়িবে কি হায়
বড় সাধনার বন চিরহরিৎ ।

না না বলে মহাঋষি জ্বেলে তপস্যার মশাল ,
নিজেকে পুড়িয়ে করিল ভস্ম
নিজেই ছিড়িল তার ভবের শৃঙ্খল ।

বিফল মনরথ নিয়ে কামিনী দেবী ,
বলে সখা,আমার কি একার দুষ ছিল সবি ,
তুমিই ত তুলে ছিলে পঞ্চশরের সুর ,
সুরে সুরে হয়েছে সখা কতরাত ভোর ,
এখন কেন একা ফেলে,চলে যেতে চাও ,
একটু দাঁড়াও আমিও আসি,তুমি যেথা যাও ।।

রক্তের ঢেউ
এবং প্রতিউত্তর আসে ,
হে মানুষ , তুমিতো দেখার কথা ছিল –
সভ্যতার মিনার চুঁড়া ভেঙে ফেলে
তেড়ে আসা রক্তাক্ত ঢেউ ,
নিভিয়ে দেয় জীবন প্রদীপ ,এশিয়া বেবিলন
ইউরোপ আমেরকা আফ্রিকা
তুরস্ক কেনো আজ মৃত্যুদ্বীপ !

ভাগ্যের তীর কখনো তেড়ে আসেনা ছুটে ,
মিহিন বাতাসের বুক ছিড়ে,যদি কোন তীরন্দাজ
নিশানা না লাগায়,অসহায় সময়ের পিটে !
জীবন তরী যাচ্ছে চলে মোহনায় ,প্রতি মুহুর্তে;
জলও তার গতিপথ নিজেই খোঁজে ,
মানুষ কিন্তু মোহগ্রস্থ , পোষা কুকুরটাও সজাগ
নিরাপত্তায় ,তার দ্বায়িত্ব বুঝে ;

হে মানব সত্বা , তুমি এখনো নখ দর্পণে স্রষ্টার ,
তোমার আত্মাতে যদিও তোমার দখল কিন্তু –
তা সময়ের খোরাক মাত্র ,
নিঃশ্বাস উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছো অজানায়-
অপেক্ষায় আছে মহাকাল অন্য এক অধ্যায় ।

অচ্ছুত সত্য
হৃদয়ের দর্পণে অস্পষ্ট একটি মুখ
কখনো ভেসে উঠে,আবার হারিয়ে যায় অন্ধকারে ,
আলোহীন জীবন ত,তাই টাহর করতে পারিনা
আজকাল মনেহয় রেটিনাতে গ্রহণ লেগেছে চিরতরে ।

বুকের মরুদ্যানে লু,হাওয়ার তান্তব লীলা
দূরে বহুদূরে ঘুর্ণায়মান অবয়ব,বায়ুর সুড়ঙ্গ পথে
পিচকারি দিয়ে ফেনায়িত রক্তের বুঁদবুঁদ নিঃসরণ
তৃষ্ণায় নেমে আসে জিহ্বা রক্তের সরোবরে কোনমতে ।

তবে কি রক্তই একমাত্র পানিয়,জঠরের ঋন
ভুলে গেছি সেই কবে,তালিয়ার তালি দেই মানবতা ভুলে ,
অচ্ছুত সত্যকে জানার ইচ্ছা ছিল প্রখর কিন্তু না
আর হবে না মনে হয়,সত্যকে রেখেছি তাসকায় তুলে ।

বঙ্গবন্ধু-কে নিবেদিত ছয়টি কবিতা

sb

আতাউর রহমান মিলাদ

আমি জন্মেছি তোমার মৃত্যুর ভেতর

আমি জন্মেছি তোমার মৃত্যুর ভেতর
আমাকে কী করে ফেরাবে এই বেহুদা সময়
জীবন ঘনিষ্ঠ রাখি তোমার মহান মৃত্যু পাঠে
জেনেছি জীবন, মৃত্যুর আরেক ঠিকানা

পায়ের চিহ্ন ভুলে ঘাসের ডগা জেগে উঠে ফের
আমিও জেগেছি দেখো তোমার মৃত্যুর ভেতর
সমস্ত সঞ্চয় জমা রেখেছি রোদের উমে
শিশির হরণ করে পৌঁছে যাব আলোর আড়তে

জন্মের অপর পৃষ্ঠায় থাকে মৃত্যুর স্পষ্ট দাগ
মৃত্যু নিয়মে হলে মেনে নেয় ফুল পাখি পাতা
যতটা পতন চিহ্ন ইঁদুরের ধারালো দাঁতে
ঘরের দাওয়ায় পুঁতেছি তাই জন্মশত্রুতা

যতই কাটাই জীবন সংসারী মোহে
হত্যার প্রতিবাদে জ্বলে উঠবই দ্রোহে

আবু মকসুদ
পিতৃঋণ

যে বুকে পিতার ছায়া, সে ছায়া জলে, অন্তরিক্ষে
সে ছায়া জেগে র’বে হাজার বছর

যে পাতিল ভেঙে পরে ঘরের আঙিনায়
সেই ঘর ছিল তাঁর বুক
সেই ঘর পারবে না মুছতে তাঁর ছায়া
যতই হোক খেলা পাতিল ভাঙার

যে বই ঘুণে পোকা খায়, পাতা ছিঁড়ে নিয়ে যায় ধূর্ত শকুন
সেই বই ছিলতাঁর চোখ, যক্ষের ধন
সেই বই মহাকালে বলে যাবে তাঁর কালকথা
শকুনেরা মিশে যাবে ধুলায় ধুলায়

কালের কালিতে যে মূর্খ করে আস্ফালন
হাঁটুজলে চড়–ইয়ের বেসাতি করে, মূর্খতা
জানবে না কোনোদিন পড়ন্ত বেলাকে সে আনে ভোরের আলোয়
হাতের তালুতে করে সমুদ্র ধারণ

যে বুকে পিতার ছায়া, সে ছায়া জলে, অন্তরিক্ষে
সে ছায়া জেগে র’বে হাজার বছর

মনে পড়ে সে বিষণœ রাতের কথা
কাপুরুষ পশুদের সীমাহীন নির্লজ্জতা
হলুদ পাখিটির ঠোঁটে এক টুকরো খড়
ঠোঁট থেকে খসে পড়ে খড়, মাটিতে মাথা ঠুকে লজ্জায়, গ্লানিতে

কাপুরুষ পশুদের মৃত্যু হয়
মূর্খদের মৃত্যু হয়
ধূর্ত শকুনের মৃত্যু হয়
পাপীদের মৃত্যু হয়
তাদের সমাধি হয় কুকুরের বিষ্ঠায়

পিতার মৃত্যু নেই
পিতা বেঁচে থাকেস ন্তানের বুকের ভিতর

শাহ শামীম আহমদ
শোকাহত পদাবলী

শোক :
চারদিকে শুধুই দীর্ঘশ্বাস
বাতাসে ভর করে আছে পনেরই আগস্টের শোক
শোকের পাথরে টুকে টুকে পিতা ভেঙে যায় বুক

খুনি :
শোকের নদীতে আছে ভালোবাসা বুকের নদীতে বিদ্যুৎ
আমি খুনি হতে চাই পিতা একবার বলে দাও
বলে দাও হে দেবদূত।

দ্রোহ :
চিত্তলোকে আনন্দ
অন্তরে দ্রোহ অন্তরে বিষ!
মুজিব নামেই যেন জ্বলে অহর্নিশ।

কাজল রশীদ
আগস্টের প্রত্যুষে

হুতোম পেঁচার কু-উ-কু-উ শব্দে বিভোর হয়ে ওঠে সমস্ত বাড়ি।
বাগানে নিস্তব্ধ পাখির কোরাস। চামেলির ডালে বসা চড়–ই পড়ছে শ্লোক।
পায়রা, ঘুঘু, শ্যামা, দোয়েল- কোয়েল, হলদে শালিক, মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে
উড়ে উড়ে নিঝুম আকাশে চেয়ে আছে আপন মনে।
ফুটছে না অভিমানে কোনো জুঁই, শিউলি, বকুল,
ডাঁটা, পুঁই, কুমড়ো লতা, মাথা নত করে বসে আছে মনঃক্ষুণে।
উলুঝুলু বন আজ এলোমেলো, বৃষ্টির জল ফিকে হয়ে গেছে, ঝিঁঝির ডাক বেসুরা,
মৃদু গুঞ্জরণে বাহারি প্রজাপতি গুলো গড়াগড়ি খায় কুসুমের পাপড়িতে।
বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া কলতালহীন দীক্ষিত নদীর তরঙ্গমালা শোকাহত।
সমস্ত ঘর, সোফা, বেড, পালঙ্ক, অলিন্দ, কাঠ, লোহা-লক্কড় একে
একে চেয়ে থাকে
শেষ যাত্রার দিকে। অন্তরঙ্গ মেষ-বৃষগুলো চেয়ে থাকে বেদনার চোখে।
আমের বোলের সুঘ্রাণে ভরে আছে চারদিক।
হুতোম অলক্ষণী বিদঘুটে ভাষায় আবার কোরাস ধরেছে।

রেজওয়ান মারুফ

তিনি

যে চলে গিয়েও চলে যায় না
থেকে যায় বার বার
যার জন্যে গন্ধরাজ সাজে চোখে আদর দেয়া সফেদ রঙে
স্নিগ্ধ ভোরে প্রজাপতি  ম্লান করে সুবাসিত শিশিরের জলে।

তারই জন্যে তো খঞ্জনা গায়
সম্মোহনী সুরের সমবেত গীত
পায়ে ঘুঙুর বেঁধে বাতাস নাচে
ঢেউয়ের খাঁজ কাটা পথে পথে
মেঘেরা নির্মাণ করে আকাশের ঢালে শান্তির বাড়ি।

কিন্তু যখন বুকের আড়ৎ পরিপূর্ণ হয় দীর্ঘশ্বাসের তেজারতে
গৌরবের প্রান্তিক ম্লান করে দেয় রক্তের তেলচিত্র
সারেঙির কান্না দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে তখন।

আর আলোরা মরে যেতে যেতে বলেযায়
এই অচেনা আঁধার তাড়াতে তার বড় প্রয়োজন আজ।

 

 

এ কে এম আব্দুল্লাহ
আলোকিত উৎসব

রাতের শেষ পাতায় কলংকিত আঁধার
জ্যোৎস্নাবিহীন বিনাশের প্রচ্ছদ।
গভীর অন্ধকার থেকে উঠে আসা
চিহ্নিত খুনিরা আজ
তোমার মৃত্যুতে করে আনন্দ
মিথ্যে জন্ম লয়, মেতে উঠে অবৈধ উৎসবে।
একদিন তুমি যাদেরকে, নিজের রক্তের মত
ঠাঁই দিয়েছিলে বুকের ভিতর ;
বন্ধ্যা সময়ের রুঢ় পথে আজ–ওরা
ক্যান্সার হয়ে ছোবল মারে দেহে
মুছে দিতে চায় তোমার অস্থিত্ব।
জীবন ভুমিকায় তোমার প্রথম ক্রন্দন ধ্বনিতে
ছিলো জগতের শক্তি,নত হয়ে ছিলো
মায়ের প্রসব বেদনার চিৎকার।
তুমি ঘর আর ভোগ ছেড়ে এসেছিলে
এখানে মৃত্যুর মিছিলে,
আলোকিত উৎসব হবে বলে।

প্রবাসী কবি আসমা মতিনকে বাসিয়া প্রকাশনী সম্মাননা প্রদান করেছে

DSC_0135প্রবাসী কবি আসমা মতিনকে বাসিয়া প্রকাশনী গত ৩১ জুলাই সম্মাননা প্রদান করে। সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আমিনুল হক ভুইয়া। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাসিয়া প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, মাসিক বাসিয়া পত্রিকার সম্পাদক গীতিকার মোহাম্মদ নওয়াব আলী, বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের উপআঞ্চলিক পরিচালক আবদুল্লাহ মো. তারিক, কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ কবি ড. মোস্তাক আহমাদ দীন, কবি ও সাংবাদিক সাইদুর রহমান সাঈদ।

শাহ আব্দুল ওদুদের পরশমণি ঃ গানে গানে শুভ জাগরণ বার্তা শিউল মনজুর

111111111111গানের দেশ প্রাণের দেশ বাংলাদেশ। সুদীর্ঘকাল থেকে এ দেশের মানুষ প্রাণ দিয়ে গানকে লালন করে আসছে। গানের ভেতর দিয়ে সুখ শান্তি আশা আকাঙ্খার বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তেমনি মুক্তির প্রদীপ জ¦ালিয়েছে গানের মধ্যদিয়েই। যা আমরা ৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষভাবে অনুভব করেছি। এক কথায় ধনী গরিব, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক সমাজের সকল পেশার মানুষের মধ্যে চেতনার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে গান। আজকের প্রচার প্রসারের যুগে বিনোদনের নানা মাত্রা লক্ষ্য করি। কিন্তু হাটতে বসতে চলতে ফিরতে এখনও গান মানুষের বিনোদনের প্রধান উপকরণ। হাট ঘাট মাঠ সর্বত্রই গান, গানের জয়জয়কার। তবে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান এবং পীর সাধকদের পূণ্যভূমি হওয়ায় গানের মাত্রায় ভিন্নতা লক্ষ্য করি। এ ভিন্নতা হচ্ছে কথার, এ ভিন্নতা হচ্ছে সুরের, এ ভিন্নতা হচ্ছে আঞ্চলিক সংস্কৃতির। শাহ আব্দুল ওদুদ রচিত পরশমণি গানের বইতে আমরা সেই ভিন্ন ধারা লক্ষ্য করি।
সিলেটের প্রথম মুসলমান হযরত শাহগাজি সৈয়দ বুরহান উদ্দিন (র.), সৈয়দা মা জননী (র.) ও শহিদ সৈয়দ গোলজারে আলম (র.)-কে উংসর্গিত বইটির নামকরণের সাথে মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুভাষ চন্দ্র নাথ এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬ সালে প্রকাশিত এই পরশমণি বইটির প্রকাশক সিলেট তথা বাংলাদেশের সু পরিচিত প্রকাশনা সংস্থা বাসিয়া প্রকাশনী। বইটির বাজার মূল্য উল্লেখ রয়েছে ১৫০ টাকা। ৬৮ পৃষ্টার এ বইটিতে গান রয়েছে ৫৭টি।
এই ৫৭টি গানের মধ্য দিয়ে তিনি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি অসীমভক্তি, দেশের প্রতি দেশের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিবেদনসহ আলোকিত সমাজগড়ার জন্য শিক্ষার প্রতি অনুরাগ, মানবতার কল্যাণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানব আত্মার মুক্তি সর্বোপরি জীববোধের উচ্চারণ উদ্ভাসিত হয়েছে। গানের পঙক্তিমালায় কিংবা তার শাখা প্রশাখায় সারল্যের গতি প্রবাহমান। গ্রন্থভূক্ত গানের মধ্যে কখনো অক্ষরবৃত্তের আবার কখনো স্বরবৃত্তের দোলা অনুভব করা যায়। একজন পল্লীগায়ের সাধারণ শিল্পী থেকে শুরু করে আধুনিক শহরের শিল্পীরাও স্বাচ্ছন্দে তাঁর গান পরিবেশন করতে পারবেন। সেই সাথে বলা যায়, গানে গানে যে ম্যাসেজ বা বার্তা গীতিকার দিয়েছেন তাও পাঠক-শ্রোতারা সহজেই আত্বস্থ করতে পারবেন। এখানে পাঠক-শ্রোতাদের জন্যে পরশমণি থেকে পাঁচটি গানের অংশ বিশেষ উল্লেখ করা হলো;
এক) সারা জাহান হয় উজালা দয়াল নবীর রহমতে
আওরে আসিক দলে দলে রওজা শরীফ জিয়ারতে।।
… … … … … …
রওজা শরীফ করিলে তোয়াফ
গোনা কছুর হয় যে মাফ
কুদরতি সাবানে ছাক
আল্লা তালার বরকতে।। (পৃষ্টা-৮)

দুই) জন্ম আমার বাংলাদেশে
ধন্য তারে ভালোবেসে
জীবন কাটাই হেসে হেসে, হাসি অনিঃশেষ।।

টিয়া, ময়না, দোয়েল, কোকিল
ঘুঘু, বুলবুল, মাছরাঙা, চিল
নদীনালা অসংখ্য বিল সুন্দর পরিবেশ।। (পৃষ্টা-১৭)

তিন) শাহজালাল বাবারই গুণে
ধন্য এই সিলেটের মাটি
আধ্যত্মিক রাজধানী খ্যাত
অমূলক নয় এই কথাটি
ধন্য এই সিলেটের মাটি।। (পৃষ্টা-১৯)

চার) ফুটলরে ইসলামের ফুল
সিলেটের হাটে মাঠে
গৌড়গোবিন্দ পরাজিত
জালাল বাবার দাপটে।।

রইল না আর কুসংস্কার
দীন ইসলাম হইল প্রচার
যার উছিলায় পাইলাম দিদার
দয়াল বাবার নিকটে।। (পৃষ্টা-২১)

পাঁচ) শ্রদ্ধা জানাই শহিদ যারা
যাদের জন্যে দেশ পেয়েছি মোরা
দেশ প্রেমিক ছিল যারা
তাদের দয়ার দান।।

সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার
পদে পদে ছালাম সবার
কয় আব্দুল ওদুদ গোনাগার
চরণ তলে মা দিও স্থান।। (পৃষ্টা-২৬)

আমি মনে করি গীতিকারের ৫৭টি গানই উল্লেখযোগ্য অর্থ্যাৎ প্রশংসার দাবী রাখে। কেননা প্রতিটি গানের মধ্যদিয়ে সুস্থ সমাজ গঠনের শুভ জাগরণ বার্তা রয়েছে। এমন একটি গানের বই জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদ নির্মূলেও ভূমিকা রাখতে পারে। বলা যায়, প্রকাশক নওয়াব আলী একটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেছেন। বইটির টেকশই বাঁধাই ও পরিচ্ছন্ন ছাপা আমাদেরকে বইটি হাতে নিতে প্রলুব্দ করে। গান লেখা সহজ কাজ নয়। গান লিখতে হলে গানের মধ্যেই অবিরাম বিচরণ করতে হয়। গীতিকার প্রাণের তাগিদে আমাদেরকে যে গান উপহার দিয়েছেন, তা আমাদের গানের জন্যে অমূল্য সম্পদ। তাঁর এই গান গুলি বর্তমান সময়ের জন্যই নয়. ভবিষ্যত প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি মনে করি। মরমী কবি হাছন রাজা, দুর্বিণ শাহ, আরকুম শাহ, রাধারমণ, বাউল স¤্রাট আব্দুল করিমের উত্তরসূরি গীতিকার শাহ আব্দুল ওদুদও সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবেন বলে আশা করা যায়। তাঁর রচিত সমগ্র গান সেই ইঙ্গিতই আমাদেরকে দিচ্ছে।

শিউল মনজুরঃ কবি ও কথাসাহিত্যিক।

অরুণাভ চট্টোপাধ্যায়’র তিনটি কবিতা

arnob

সূর্যগ্রহন

সূর্য নিভে গেছে জোনাকির মতো-
তোমার কৃত্রিম সূর্য দেখে।
হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবো এ লাভা
আর এ পৃথিবীর যত অগ্নুৎপাত , –
তোমার সূর্য দহন থেকে।
একবার শুধু মৃত্যু দাও যদি,
আপামর নগরীর সামনে হও আমার কাতিল ।
যত পান্ডুলিপি জমেছে এ ভ্রষ্টজন্মে,
নির্মম হয়ে করবো সব বাতিল ।
গোলাপি চার দেওয়ালের বুকে,
অপলক ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া
সহস্র সূর্যের ছাই দিয়ে
তোমার একমুঠো গ্রাস।
তুমি হে অক্ষয় বরাভয় আমার
হে তুমি আমার অনন্ত ত্রাস … ।।

ননসেন্স কবিতা

চরিতাভিধানের দ্বিতীয় খন্ডটা হঠাৎ বন্ধ করে দিলে তুমি
সঞ্চয়িতার কিছু পাতায় আজও
গীতবিতানের ছেঁড়া পাতার বুকমার্ক
আজ আকাশ ফুঁড়ে জন্ম নিচ্ছে ননসেন্স কবিতারা
এভাবেই নিটোল ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে
রোজ রাতে তুমি ফিরে ফিরে আসো
স্লিপিং পিলস্‌এর ব্যর্থতায়
আবারও মিশে যাও পার্ক স্ট্রীটে বিকানো যৌবনের নেশায়
চলতে থাকে তোমার ঘুমের মধ্যেই
সূর্যকে ছুঁতে চাওয়ার অদম্য প্র্যাকটিস
ক্লিওপেট্রা, তোমাকে কি আজও যৌনতার ভার বইতে হয়?

এক্স = প্রেম

নাহ্‌, ইদানীং আর প্রেমের কবিতা লিখিনা
কোনটা ঠিক কোনটা ভুল জানি না,
জানতেও চাইনা তবে …
তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম বা আরও কোনও
এক্স তম পুরুষের তাঁর জীবনে আনাগোনা,
আমার প্রেমের কবিতার ক্ষতির কারণ
ছিল, আজও আছে … আগামীতেও থাকবে।
দায়ভার তাঁর, আমার নয়।
এখানে এক্স = প্রেম ইকুয়েশন কাজ করেনি …

কুতুব আফতাব’র একগুচ্ছ কবিতা

kutub

অন্ধকবি

বুকসাগরে জেগে উঠেছে নিঝুম দ্বীপ
এক অন্ধকবি নিয়েছে জলজ জীবন
দেখেনা মাস্তুলের শির
শুধু হুইসেলের শব্দ আসে কানে
জানে না কোন জাহাজ
যায় কোন বন্দরে
তবুও জীবন আর চলনের
বিমূর্ত চিত্র আঁকে কল্পনার রঙে।

অস্থির

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আমার আত্মার আত্মীয়
প্রতিটি ঘরে আমার উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার
যেখানে যেতে পারি সেখানে হৃদয়খোলা সম্ভাষণ
পারিনা যেখানে যেতে সেখানে আমার অপারগতা
অসীমের কাছে পেলাম অপরিসীম অধিকার
পেলাম দানকৃত বিবেকের অনন্ত স্বাধিকার
নিয়ন্ত্রনের কঠিন দাসখত আমি দিয়েছি আমাকে
এ নয় আমার সীমাবদ্ধতার চৌকাঠে লটকে থাকা সমাচার
আমি এক মুক্ত আকাশ মেঘ আর রোদের আধার
আমাকে করো না মাপজোক বিচ্ছিন্ন কৃতকর্মের ফিতায়
অখন্ড সময়ের যাত্রী কত পথে ফেলতে হয় পদক্ষেপ
এক পথে খুঁজো না বিমুগ্ধ পথিকের পদচিহ্ন
মন আর দেহ কখন স্থির নয় অস্থির জীবনযাত্রায়
আমিও আপাদমস্তক অস্থির এক যাযাবর
মন উড়ে শঙ্খচিলের উল্লাসী ডানায়
ঘুরে বুনোশালিকের বাসায় বাসায়
ভাসান জলে পানকৌড়ির সাথে খেলে জলকেলী
গঙাফড়িংয়ের লেজ ধরে পাড়ি দেয় তেপান্তর
আমার মনের ঠিকানা খুঁজে কেউ হইও হয়রান।


বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট

ঘুমভাঙা সকালে ধুমায়িত চায়ে ভেজাই মাক্ষন দলিত টোষ্ট
নিমিষে ফুরায় আরম্ভের প্রারম্ভিক আমেজ
ফন্দি ফিকির আঁটি দুপুরের লাঞ্চ সাড়তে হবে কোন রেস্তোরায়
মরিয়া মনোরতে তড়িঘড়ি ছাড়ি বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট
আহার শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে হাত মুছি স্বপ্নের তোয়ালে
রাতের ডিনারটা আরেকটু যুথসই চাই
রিজিকে সহায় হন অন্নদাতা
পূর্ণাঙ্গ দিনাতিপাতের আনন্দে ভুলে যাই
গত হওয়া একটি দিনই জীবন ছিল
বোধের অলিগলী হাঁটি আয়েসী আবাসিক ভাবনায়
স্বপ্ন সাজাই বর্ধিত কলেবরে
স্বপ্ন গোছাতে রাত ঘনায়
চোখে স্বাভাবিক নিয়মে নামে ক্লান্তির ঘুম
অসমাপ্ত কাজ হাতে নিয়ে আবার ফিরি তড়িঘড়ি কোন এক বেড এন্ড ব্রেকফাস্টে।

শোকবই

৭৫ থেকে হৃদয়ে খুলে রেখেছি
একটি শোকবই
কে করল কে করল না স্বাক্ষর
যায় আসে না কিছু
এ আমার একান্ত ব্যক্তিগত
শোক গ্রন্থনা
হত্যার কোন যুক্তি কিংবা
ব্যাখ্যা আমি মানিনা
আমি মানুষের রক্তপাতে
ধর্ম বর্ণ দল বুঝি না
একা একঘরে হয়ে যাব
বিশাল জনপদে
আমুল বন্দি হয়ে যাব
নিজস্ব চৌহদ্দিতে
তবুও বিবেকের মুক্তিতে বাঁচব
এক অহংকারী জীবন
খবরদার আমাকে কেউ
কোন খুনের পক্ষে সাফাই দিতে এসোনা।

কাজী নাহিদ আক্তার’র একগুচ্ছ কবিতা

nahid

রাজপথ ভেসে যাচ্ছে
সময়ের পায়ে ছোট্ট একটা ছিদ্র দেখলাম
গল গলিয়ে রক্ত ঝরছে, রাজপথ ভেসে যাচ্ছে।
যত্র তত্র ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে বলে
দীর্ঘ পথটা একা চলার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলেছে।
খুব নীরবে অবচেতন মনে
মস্তিস্কে জমানো উন্মুক্ত চিন্তা,
তার রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করতে পারছে না।
নিয়মিত অনিয়মের ধাক্কায়
বিষণ্ণতা আজ সত্যের বিকল্প খুঁজছে,
যার অস্তিত্ব ইতিহাসের মঞ্চে কেবলি
গুণ্ডামি আর ভণ্ডামি।
দুঃসময়টা অচমকা জুবু থুবু হয়ে মিসে যায় অজান্তেই ।
মুঠো ভর্তি আগুন নিয়ে ছড়িয়ে দেয় মস্তিস্কের কোষে কোষে,
অনুভুতির অশ্লীল দহনে নির্বোধের মত
জাগিয়ে তোলে কষ্টের তুফান।
আমার আমিত্ব লজ্জায় লুকিয়ে রাখে বুক পকেটে,
তার শেষ অশ্রুবিন্দু।
নৈরাজ্য ছড়িয়ে দিয়ে
শুন্য জীবনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে সময় ।
ক্লান্ত চোখ বিক্ষুদ্ধ দুঃস্বপ্নের অভিমুখে
নিরন্তর হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছে,
ঠক ঠক ঠক।

শুভঙ্কর

-শুভঙ্কর, তুমি নাকি আজকাল আমাকে
আর মনেই করতে পাড়ছ না,
এমন তো কথা ছিল না।
-রাজ্যের সব সুখ তো তোমায় দিয়েছিলাম।
-ফাঁকি ছিল হয়তো।
-শুকতারাটা তোমার খোঁপায় পড়িয়েছিলাম।
-পুষ্টিহীনতায় ঝরে গিয়েছিল,
করুন মৃত্যু হয়েছিলো শুকতারাটির।
ভীষণ ক্ষুধার্ত,
অনাহারে বার বার অশরীরী আত্মার মতো
লেলিহান হয়ে উঠেছিলাম।
মনের নষ্টামিতে ভরে গিয়েছিল মনটা
কিন্তু শুভঙ্কর, তোমার আঙ্গুলের সেই স্পর্শ
আজ আমি অনুভব করি।
-আমি কখনো তোমাকে ভুলতে পারিনি
না এখনো।
-মিথ্যুক।
-প্রত্যাখ্যানে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
– সে জন্য শুভঙ্কর তুমি আমাকে
আর মনে ই করতে পারবে না !
কি দেইনি তোমাকে আমি।
মুখোমুখি তোমার দাঁড়াবার সাহস ছিল না,
বলো
আমি তোমাকে কি ক্ষমা দেইনি।
-নীল খামে তোমার চিঠি,
তোমার আঙ্গুলের ছাপ
এখনো আমাকে দোলা দেয়।
প্রদীপের আলোতে তোমার সুন্দর মুখটা
আরশি ভেদ করে এখনো
আমাকে দূরে যেতে দেয় না।
-আমি এখনো তোমার কথা মাঝে মাঝে ভাবি।


বিকেলটা আমাকে দিও

আজ বিকেল টা পুরোপুরি আমায় তুমি দিয়ে দিও।
ইতিহাস তোমায় অমরত্ব দিবে।
সময় আমাকে সামনে চলার কলাকৌশল শিখিয়েছে।
ভ্রষ্ট মানুষের অশুভ ভাবনা
আমাকে প্রচণ্ড আক্রোশে কাঁদায়,
অগণিত কবির মতো অকাল প্রয়ানে
আমার কোন ক্ষোভ নেই।
কোন কিছুকেই তোয়াক্কা না করে,
শিমূলের লজ্জার লাল আর
শান্ত বেলীর সাদা ফুলে
খোপায় সাজিয়েছি ,
তোমায় দেখাব বলে।
আজ বিকেল টা পুরোপুরি আমায় তুমি দিয়ে দিও।
বৈশাখের শেষ বিকেলের বয়ে যাওয়া মৃদু হাওয়া,
আমার সমস্ত ভাবনা গুলো এলো মেলো করে দিল।
সমস্ত ভাবনা গুলো খুলে রেখে
অপেক্ষায় থাকি,
যে অপেক্ষার সেতারে বেধে দিয়েছে ,
অনন্ত কাল ধরে বয়ে চলা
হলুদ স্বপ্নের অনুভূতি।
আজ পুরোটা বিকেল তুমি আমাকেই দিও।
বেহিসাবি হয়ে ক্লান্ত নয়নে উৎকণ্ঠায়
ছুঁয়ে যেতে চায় তোমার চোখ ।
পড়ন্ত বিকেলটাকে,
বহুদিনের জমে থাকা গোপন হাহাকারে
ছদ্ম নামে চিঠি লিখে।
তুমি রোদ আঁচড়ানো চোখে,
অন্ধকারের স্বপ্নগুলো পড়িয়ে দিও
আমার খোপায়।

শোন

শোন,
ভরদুপুর
আসে পাসে কেউ নেই।
ভাবছি তোমাকে,
শুধুই তোমাকে ,
বলি শোনো
কেউ যেন না শুনে।
শুধু
তুমি আর আমি,
শুকিয়ে গলা
বলবো কি করে।
একটু পানি,
আলাদা নিশ্বাস ,
হঠাত দেখি ,
তৃপ্ত চোখ ।
তুমি পাশে
চোখে চোখ।
মেঘেদের লুটোপুটি,
নীল আকাশ ,
আমাদের স্তব্ধতা
স্পর্শ মনে।
আনন্দের ছাপ
চোখে চোখে ,
বেহিসেবি চাওয়া
সবই না পাওয়া।
অতৃপ্ত,
কষ্ট ,
না বলা কথা।

তৌহিদ শাকিল’র একগুচ্ছ কবিতা

towhid ছাই ফুঁড়ে ছুঁতে চায়

আমি একবারও দিতে পারি না চুমুক,
যতবার কাছে আনি মুখ
কী এক অদ্ভুত তরল দেখি পেয়ালায়;
ভাসমান অসংখ্য বাঘের মৃত চোখ ফুঁড়ে হায়,
যেন কোন বাষ্প নয়,
কতগুলো মৃত পাখি উড়ে যায়!
জেগে ওঠে সহস্র গাছের ফসিল,
ছাই ফুঁড়ে ছুঁতে চায় অনন্ত আকাশের নীল!

ক্ষত

তুমি যেই হও না কেন,
হয়ো রক্তাক্ত জবাবের দিকে
ধাবমান রক্তের মতো।

অসম্ভব সুন্দর
এক জোঁকের মতো,
আমি রক্তের অধিবাসী,
এক জীবন্ত ক্ষত।

তৃণ

আমার কোনো নাম নেই,
আমি এক তুচ্ছ তৃণ,
কিন্তু আমার কি একটুও দাম নেই?

তোমরাই তো বলেছিলে,
অজস্র বিন্দু
এক হয়ে গড়ে তোলে
ঐ মহাসিন্ধু।

তবে কেন সূর্য ঘুমোলে
অন্ধকারে
জোছনা মেলে,
নীলাম্বরে
আজ আর জ্বলে না কোন ইন্দু?

তবে কেন জলের আশীর্বাদে
ঝরে না বৃষ্টিবিন্দু?

বনের অলংকারে

অসম্ভব অলৌকিক সম্পদ অফুরান
গভীরে নিশ্চিত গচ্ছিত আছে, তাই
ও পথে হারাবার কোন দুশ্চিন্তা নাই,
চিন্তার ভাণ্ডার খুলে ঋদ্ধ করো প্রাণ।
বঙ্গজ সন্তান তুমি, ক্ষমতার আতিশহ্যে
আমাকে পুড়িও না মনের অহংকারে।
আমি মা মাতৃভূমি, বাঙালী ঐশ্বর্যে
আমাকে সাজিয়ে দাও বনের অলংকারে।

Developed by: